একসময় আশঙ্কা করা হতো ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাত হয়তো পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়বে। সেই আশঙ্কাই এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে, বিশেষ করে এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি জড়িয়ে পড়ার পর। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন এতটাই অস্থিতিশীল যে ইরান যেমন পিছিয়ে নেই, তেমনি সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশও আর নীরব দর্শক হয়ে থাকতে চাইছে না। পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ইরান ও সৌদি আরব কার্যত মুখোমুখি অবস্থানে চলে এসেছে।

ইরান ও সৌদি আরবের মুখোমুখি অবস্থান
প্রথম দিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হামলার ক্ষেত্রে ইরান কিছুটা সংযত থাকলেও এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। তেহরান দাবি করছে, তারা মূলত মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে ইরানের হামলার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে, যার আঘাত এসে পড়ছে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনাগুলোতেও। এমন অবস্থায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সামরিক পদক্ষেপের কথা ভাবতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে সৌদি আরব ইরাক ও ইয়েমেনে ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ইরানকে মোকাবিলা এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশকে নিয়ে একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তাজোট গঠনেরও ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব।
আরও


বাণিজ্যপথ নিয়ে সংকট
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে। ইরান ও ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতায় সৌদি আরবের জন্য হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের নৌপথ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই পরিস্থিতি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য চরম উদ্বেগের। তারা যেকোনো মূল্যে এই বাণিজ্যপথগুলো নিরাপদ করতে চায়। কারণ, বিশ্বের তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ একসময় এই হরমুজ প্রণালির মাধ্যমেই পরিবাহিত হতো। কিন্তু ইরান এ বিষয়ে কোনোভাবেই আপস করতে রাজি নয়। তাদের স্পষ্ট দাবি, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা ও সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নিতে হবে। তা না হলে ইরানে হামলার জন্য যেসব দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করা হবে, সেসব দেশকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
সামরিক শক্তিতে কে কতটা শক্তিশালী?
সৌদি আরব এত দিন সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলতে চাইলেও এখন তাদের সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে হচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, সামরিকভাবে দেশটি কতটা শক্তিশালী এবং ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে গেলে তারা টিকে থাকতে পারবে কি না।


২০২৬ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের (জিএফপি) সূচক অনুযায়ী:
র্যাঙ্কিং: বিশ্বের ১৪৫টি দেশের মধ্যে সামরিক শক্তিতে ইরানের অবস্থান ১৬তম আর সৌদি আরবের ২৫তম।
স্কোর: জিএফপি সূচকে ইরানের স্কোর ০.৩১৯৯ এবং সৌদি আরবের ০.৪৪৭৩ (স্কোর যত কম, সামরিক শক্তি তত বেশি)।
সামরিক জনশক্তি: ইরানের মোট জনসংখ্যা ৮ কোটির বেশি, যার মধ্যে সামরিক বাহিনীতে কাজ করার মতো জনশক্তি প্রায় ৪ কোটি ৯৪ লাখ। অন্যদিকে সৌদি আরবের জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৫ লাখের মতো, যার মধ্যে সামরিক জনশক্তি প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ।
সক্রিয় সেনাসদস্য: ইরানের মোট সামরিক সদস্য প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজার (সক্রিয় ৬ লাখ ১০ হাজার, রিজার্ভ ৩ লাখ ৫০ হাজার)। অন্যদিকে সৌদি আরবের মোট সামরিক সদস্য প্রায় ৩ লাখ ৯৭ হাজার (সক্রিয় ২ লাখ ৪৭ হাজার, কোনো রিজার্ভ নেই)।
স্থল ও আধাসামরিক বাহিনী: স্থলবাহিনীতেও ইরান অনেক এগিয়ে। ইরানের সেনাবাহিনীতে সদস্য প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার, যেখানে সৌদি আরবের মাত্র ৭৫ হাজার। আধাসামরিক বাহিনীতেও ইরানের সদস্য ২ লাখ ২০ হাজার আর সৌদি আরবের ১ লাখ ৫০ হাজার।


সৌদি আরবের ত্রিমুখী নিরাপত্তা হুমকি
বর্তমানে সৌদি আরব একসঙ্গে তিনটি দিক থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে রয়েছে—ইরান, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী এবং ইরাকের সশস্ত্র মিলিশিয়া। হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ইরাক থেকে ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে পূর্ব ইরাকে বিমান হামলা চালিয়েছে। মার্চ মাসের শেষের দিকে সৌদি বিমানবাহিনী ইরানের ভেতরেও গোপন হামলা চালিয়েছিল বলে দাবি করা হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে তা নিশ্চিত করা হয়নি।
ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি
ইরান ইতিমধ্যে আঞ্চলিক দেশগুলোকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছে। দেশটির খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহি বলেছেন, কোনো দেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেয় বা ওয়াশিংটনের ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তাকেও যুদ্ধের চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র মুসলিম দেশগুলোর অর্থ, সম্পদ ও অবকাঠামো ব্যবহার করে এই অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের এক ‘বিপজ্জনক কৌশল’ নিয়েছে।


শেষ পর্যন্ত কে এগিয়ে?
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সামগ্রিক সামরিক শক্তিতে সৌদি আরবের চেয়ে ইরান বেশ বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। তবে আধুনিক যুদ্ধ শুধু সেনাসদস্যের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, উন্নত অস্ত্রশস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা, গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তি এবং শক্তিশালী সামরিক মিত্রের উপস্থিতিও এখানে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইরান ও সৌদি আরব যদি সরাসরি সংঘাতে জড়ায়, তবে শুধু র্যাঙ্কিং দিয়ে এর চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বরং দুই দেশের কৌশল এবং তাদের মিত্রদের ভূমিকাই এই যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।







