ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক এবং ভয়াবহ হামলার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সৌদি আরবের ভাবমূর্তি এখন চরম হুমকির মুখে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ব্যবসা, বিদেশি বিনিয়োগ এবং পর্যটনের একটি নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দেশকে তুলে ধরার যে চেষ্টা করছিলেন, এই হামলাগুলো তার মূল ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে দেশটির অর্থনীতিতে। গত রোববার রিয়াদে অনুষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সম্মেলনে হাতেগোনা কয়েকজন প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন। আগামী দুই সপ্তাহ পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সৌদির সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক আয়োজন ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’-এর সফলতা নিয়েও এখন গভীর শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

দেশের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার এই চরম ব্যর্থতায় দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মনে গভীর আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। উচ্চ বেতনের চাকরি এবং বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে যুক্তরাজ্যের নাগরিকসহ অনেক প্রবাসী এখন পরিবার নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন। বিলাল ও মোহাম্মদ নামের দুই প্রবাসী জানান, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরগুলোকে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত থেকে রক্ষা করতে না পারায় তারা রীতিমতো আতঙ্কিত। স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অনেক বিদেশির প্রকাশ্যে দেশ ছাড়ার ঘোষণায় রিয়াদ শহরটি এখন আর তাদের কাছে নিরাপদ মনে হচ্ছে না।
আরও
এই সংঘাতের শিকড় মূলত ২০১৪ সালে শুরু হওয়া ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের গভীরে, যখন হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে নেয় এবং ২০১৫ সালে সৌদি জোট ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। তবে সম্প্রতি এই উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায় গত জুলাই মাসে সানা বিমানবন্দরে সৌদি জোটের হামলার পর। এর জবাবে হুতিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং সৌদির কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে আক্রমণ তীব্র করে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার পর লোহিত সাগরই ছিল সৌদি আরবের তেল রপ্তানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ, যা এখন হুতিদের কড়া হুমকিতে অবরুদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।


দীর্ঘকাল ধরে সামরিক সুরক্ষায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের অস্ত্রের ওপর বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের ভূমিকায় রিয়াদ চরম হতাশ। কয়েক দশক ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে নিজেদের কৌশল সাজালেও, বিপদের মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সৌদি আরব নিজেকে রক্ষায় সক্ষম’ মন্তব্য রিয়াদকে গভীরভাবে হতাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় রিয়াদ বুঝতে পেরেছে, বিপদের সময় মার্কিন অংশীদারিত্বের ওপর পুরোপুরি ভরসা করা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
মার্কিন নির্ভরতার এই চরম অনিশ্চয়তা থেকেই সৌদি আরব এখন নিজেদের সুরক্ষায় নতুন মিত্র খুঁজছে। যার ফলশ্রুতিতে গত আগস্ট মাসে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে রিয়াদ। যদিও সৌদিতে তুর্কি সেনা মোতায়েনের সময় ও পরিধি নিয়ে এখনো কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে, তবে এই সম্মিলিত চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং সৌদির নিরাপত্তা কৌশলে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।









