দীর্ঘ ৭৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের অতল গভীরে সন্ধান মিলেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্যান অ্যাম এয়ারলাইনসের বহুল আলোচিত ফ্লাইট ৫২৬এ-এর ধ্বংসাবশেষ। ১৯৫২ সালে মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ক্যারিবীয় সাগরের নিকটবর্তী আটলান্টিকের বুকে আছড়ে পড়েছিল বিমানটি। সে সময় ৬৪ জন যাত্রী ও পাঁচজন ক্রুর মধ্যে মাত্র ১৭ জন প্রাণে বাঁচতে সক্ষম হলেও বাকি ৫২ জনকে উত্তাল সমুদ্রের হিমশীতল স্রোত চিরতরে গ্রাস করেছিল। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সমুদ্রের বুকে হারিয়ে থাকা বিষাদময় এই অধ্যায়টি সম্প্রতি আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে পুনরায় সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পুয়ের্তো রিকো উপকূল থেকে বেশ কিছুটা দূরে সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় দুই হাজার ফুট গভীরে এই ধ্বংসাবশেষের অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে। এই দুঃসাধ্য অভিযানে যৌথভাবে কাজ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘এয়ার/সি হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’ এবং সমুদ্রতলের অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিপ সি ভিশন’। অত্যাধুনিক উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন সোনার প্রযুক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় আন্ডারওয়াটার ড্রোনের সাহায্যে পুরো অনুসন্ধান প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়। সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট রাস ম্যাথিউস এই আবিষ্কারকে একটি অভাবনীয় ও আবেগময় মুহূর্ত হিসেবে আখ্যায়িত করে দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। ইতিমধ্যে ড্রোন ব্যবহার করে দুর্ঘটনাস্থলের প্রায় সাড়ে তিন লাখ থ্রিডি ছবি ও ডেটা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে এটিকে একটি ঐতিহাসিক সমাধিক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে নিহতদের দেহাবশেষ বা ধ্বংসাবশেষ উত্তোলনের কোনো পরিকল্পনা আপাতত গবেষকদের নেই।
নিউইয়র্কগামী চার ইঞ্জিনের ওই যাত্রীবাহী বিমানটি পুয়ের্তো রিকোর সান জুয়ান থেকে উড্ডয়নের কিছু সময় পরই বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটির মুখে পড়েছিল। পুরোনো তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র ৩৫০ ফুট উচ্চতায় থাকা অবস্থায় প্রথমে বিমানটির তৃতীয় ইঞ্জিনটি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পাইলট ক্যাপ্টেন জন সি. বার্ন জরুরিভিত্তিতে বিমানবন্দরে ফিরে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেন, কিন্তু মাঝপথেই চতুর্থ ইঞ্জিনটিও কাজ করা বন্ধ করে দেয়। কোনো উপায় না দেখে পাইলট দ্রুত উচ্চতা হারানো বিমানটিকে বাধ্য হয়ে সমুদ্রে জরুরি অবতরণ বা ‘ডিচিং’ করান। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে প্রচণ্ড গতির কারণে পানির আঘাতে বিমানটি দুই টুকরো হয়ে যায়। দুর্ঘটনার পর যাত্রীদের অনেকেই বিমানের ধ্বংসাবশেষ আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করলেও লাইফ র্যাফটের অভাব এবং ঢেউয়ের তোড়ে অধিকাংশ যাত্রীই তলিয়ে যান।
আরও
প্যান অ্যামের এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি সে সময় গোটা বিশ্বের এভিয়েশন শিল্পে যাত্রী নিরাপত্তার প্রশ্নে এক বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছিল। মূলত এই দুর্ঘটনার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলে নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে ঢেলে সাজানো হয়। ফ্লাইটে যাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূলক সেফটি ব্রিফিং, লাইফ জ্যাকেটের সঠিক ব্যবহার, পর্যাপ্ত লাইফ র্যাফট রাখা এবং জরুরি অবস্থায় পানিতে অবতরণের মতো বিষয়গুলোতে কঠোর নিয়মকানুন আরোপ করা হয়। পাশাপাশি উড়োজাহাজের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রাক-উড্ডয়ন পরিদর্শনের ওপরও জোর দেওয়া হয়, যা আজও বিশ্বজুড়ে নিরাপদ বিমান যাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।










