জীবিকার তাগিদে প্রতিবছর হাজারো বাংলাদেশি পাড়ি জমান দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপে। কিন্তু পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে অনেকেই ফিরছেন লাশ হয়ে। দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে মালদ্বীপে স্ট্রোক, হৃদরোগ, দুর্ঘটনা ও আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনায় আটজন প্রবাসী বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের বয়সের পরিসংখ্যান বেশ উদ্বেগজনক, যাঁদের অধিকাংশই ২১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী। মূলত স্ট্রোক ও হৃদরোগেই বেশিরভাগের মৃত্যু হয়েছে। হঠাৎ করে তরুণ ও মধ্যবয়সী এই প্রবাসীদের অকালমৃত্যু প্রবাসী কমিউনিটি ও দেশে থাকা স্বজনদের মাঝে গভীর শোক ও শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
দুর্ঘটনা ও অস্বাভাবিক কারণে প্রাণ হারিয়েছেন বেশ কয়েকজন তরুণ প্রবাসী। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের ২৩ বছর বয়সী তরুণ রবিউল ইসলাম রওশন মাত্র সাত মাস আগে মালদ্বীপে গিয়েছিলেন। কর্মস্থলে মিক্সার মেশিনের এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, ভাগ্য বদলের আশায় দেড় বছর আগে মালদ্বীপে যাওয়া মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার ২১ বছর বয়সী সোলাইমান মাতব্বর কর্মস্থলে ভুলবশত তারপিন পান করে মারা যান। এ ছাড়া ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার শরীফাবাদ গ্রামের ৩৭ বছর বয়সী বদিউর রহমান ১০ বছর ধরে মালদ্বীপে কর্মরত ছিলেন। গত শনিবার নিজ কক্ষে তিনি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে জানা গেছে, যা বর্তমানে স্থানীয় প্রশাসনের তদন্তাধীন রয়েছে।
অধিক পরিশ্রম, মানসিক চাপ ও একাকিত্বের কারণে স্ট্রোক এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আরও পাঁচজন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার সোনারগঞ্জ গ্রামের ৪৫ বছর বয়সী হুমায়ুন কবির, শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ৪৪ বছর বয়সী সায়েদ মোল্লা এবং কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ৪৭ বছর বয়সী মকবুল মিয়া—এই তিনজনই প্রায় দুই দশক ধরে মালদ্বীপে বৈধভাবে কাজ করছিলেন। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে তাঁরা সবাই স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এ ছাড়া ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার ৪৫ বছর বয়সী মো. শেখ ফরিদ আগে থেকেই ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তিনিও স্ট্রোকে প্রাণ হারান। অন্যদিকে, মালদ্বীপের থ্রিটপ হাসপাতালের অজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ড. নবির স্ত্রী, বরিশালের ৭০ বছর বয়সী দেলোয়ারা নবিও ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন।
আরও
পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের আকস্মিক এই মৃত্যুতে দেশে থাকা স্বজনেরা শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। প্রিয়জনের মরদেহগুলো দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে তাঁরা সরকার ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এ বিষয়ে মালদ্বীপের বাংলাদেশ হাইকমিশন জানিয়েছে, তাঁরা পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত আছেন। এরই মধ্যে হুমায়ুন কবির ও সায়েদ মোল্লার মরদেহ দেশে পাঠানো হয়েছে এবং পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাকিদের মরদেহও দ্রুত দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অভিবাসন ব্যয়ের তুলনায় আয় কম হওয়ায় প্রবাসীদের মধ্যে তৈরি হওয়া মানসিক চাপ এবং দীর্ঘকাল পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে সৃষ্ট একাকিত্বই মূলত তাঁদের হৃদরোগ ও স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান কারণ।










