‘আদরের ছেলে রেখে চলে যাচ্ছি প্রবাসে’ — ২৩ আগস্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় এই লেখাটিই ছিল ওমান প্রবাসী মোশাররফ হোসেন রনির শেষ পোস্ট। ঠিক দেড় মাসের মাথায়, সেই সন্তানকেই রেখে এবার চিরতরে বিদায় নিলেন রনি।
বুধবার দুপুরে ওমানের দুখুমে মাছ ধরে ফেরার পথে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান রনি ও আরও সাত বাংলাদেশি। তাদের সবাই চট্টগ্রামের সন্তান— সাতজন সন্দ্বীপের, একজন রাউজানের। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় প্রবাসী কমিউনিটি।

আরও
সারিকাইত ইউনিয়নের মানুষ বলছে, এমন দৃশ্য তারা আগেও দেখেছে— ২০২১ সালেও একই জায়গায় মাছ ধরার পর ফেরার পথে প্রাণ হারিয়েছিলেন পাঁচজন প্রবাসী। বারবার একই ট্র্যাজেডি, একই কান্না— কিন্তু বদলায়নি ভাগ্য।
দুকুম ওমানের রাজধানী মাস্কাট থেকে ৬০০ কিলোমিটার দূরের এক মরুভূমি। কাজ না পেয়ে অবৈধভাবে সাগরে মাছ ধরেন বহু বাংলাদেশি। নেই নির্দিষ্ট আয়, নেই নিরাপত্তা। কখনো পুলিশের ধাওয়া, কখনো বেপরোয়া গাড়ির চাপা— জীবন চলে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায়।


একজন প্রবাসী বলেন, “সেখানে আমরা মাছ ধরি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। অনেক সময় গাড়ির ভেতরই ঘুমিয়ে থাকি, আবার ধরা পড়লে জেল খাটতে হয়।”
সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে ওমান গিয়েছিলেন আমিন খান নকিব। কাজ না পেয়ে বাধ্য হয়ে দুকুমে তিন মাস মাছ ধরেন, আয় মাত্র ২০ হাজার টাকা। পরে ধরা পড়ে জেল খাটেন, দেশে ফিরে ভিসা নবায়নও বন্ধ হয়ে যায়। তার আক্ষেপ— “দূতাবাসের কাছে আশ্রয় চেয়েছি, কিন্তু সাড়া পাইনি।”
তবে এবারের দুর্ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেয় বাংলাদেশ দূতাবাস। ঘটনার পরপরই প্রতিনিধি পৌঁছে যান ঘটনাস্থলে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দূতাবাসের এক কর্মকর্তা বলেন, নিহতদের একেক জনকে একেক হাসপাতালে রাখা হয়েছে। এক হাসপাতাল থেকে আরেকটার দূরত্ব ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার। তবে একটা সুবিধা হলো— নিহত সবারই স্পন্সর একই ব্যক্তি। আমরা স্পন্সর ও রয়েল পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছি। পুলিশ জানিয়েছে, রবিবার তারা তদন্ত প্রতিবেদন দেবে। প্রতিবেদনের পর স্পন্সর ও সরকারি খরচে লাশগুলো দেশে পাঠানো হবে। সব ঠিকঠাক থাকলে ১৫ অক্টোবরের মধ্যেই লাশগুলো দেশে পাঠানো সম্ভব হবে বলে আশা রাখছি।


ওই কর্মকর্তা আরও জানান, নিহত আটজনের মধ্যে শুধুমাত্র একজনের ইনস্যুরেন্স ছিল। তিনি এক-দুই মাসের মধ্যে ৫ হাজার ওমানি রিয়াল (প্রায় ১৬ লাখ টাকা) ক্ষতিপূরণ পাবেন। এখানকার আইনে বলা আছে— গাড়ির ইনস্যুরেন্সের আওতায় যাত্রী যে-ই হোন না কেন, আইনি প্রক্রিয়ায় জয়ী হলে প্রতি যাত্রী ১৫ হাজার রিয়াল পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার রাখেন।
এই ঘটনার ক্ষেত্রেও সেই সুযোগ প্রযোজ্য হবে বলে আমরা আশাবাদী। তবে এজন্য চার ধাপে আইনি লড়াই করতে হবে। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের দূতাবাসকে (কোনো ব্যক্তিকে নয়) পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিতে হবে। এরপর দূতাবাস আইনজীবী নিয়োগ দেবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগতে পারে।











