মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতার ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দুবাইয়ের পর্যটন খাতে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতির মাঝেই বিশ্বের অন্যতম বিলাসবহুল আইকনিক হোটেল ‘বুর্জ আল আরব’ আগামী ১৮ মাসের জন্য বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারকাজের কথা বলা হলেও, মূলত আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট ও পর্যটক খরাকেই এর পেছনের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংস্কারকাজ ও বিকল্প ব্যবস্থা
গত মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) হোটেলটির মালিকানা প্রতিষ্ঠান জুমেইরাহ এক বিবৃতিতে জানায়, পরিকল্পিত এই সংস্কারকাজ ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হবে। প্যারিসভিত্তিক খ্যাতিমান ইন্টেরিয়র আর্কিটেক্ট (অভ্যন্তরীণ স্থপতি) ট্রিস্টান আউয়ার এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দেবেন। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হোটেলটির এক কর্মী জানিয়েছেন, সংস্কার চলাকালীন বুর্জ আল আরব সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। যেসব অতিথি ইতিমধ্যে বুকিং করে রেখেছেন, তাঁদের জন্য আশপাশের সমমানের বিলাসবহুল হোটেলে থাকার বিকল্প ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

আরও
নিরাপত্তা সংকট ও ড্রোন হামলার প্রভাব
সংবাদমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে ইরানের ড্রোন হামলার সময় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংসাবশেষের আঘাতে আইকনিক এই হোটেলটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জুমেইরাহ গ্রুপ তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে হামলার বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ধারাবাহিক হামলাই পর্যটন খাতে এই ধস নামিয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, গত ২৮ মার্চ পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্য করে প্রায় ৩৯৮টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ১ হাজার ৮৭২টি ড্রোন এবং ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইসরায়েলের পর উপসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে আমিরাত। দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এর অধিকাংশই প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে পাম জুমেইরাহ, দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ফুজাইরাহর তেলশিল্প এলাকাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দুবাইয়ের অর্থনীতিতে। বিদেশি পর্যটক ও প্রবাসীদের ব্যাপক হারে দেশত্যাগের কারণে নিরাপদ ও স্থিতিশীল ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে দুবাইয়ের দীর্ঘদিনের সুনাম এখন চরম হুমকির মুখে। সংঘাত শুরুর মাত্র এক মাসের মধ্যেই দুবাই ও আবুধাবির শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য হাওয়া হয়ে গেছে এবং ১৮ হাজার ৪০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সৌদি আরব বা ওমানের মতো তেলনির্ভর দেশগুলো বৈশ্বিক জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে কিছুটা লাভবান হলেও পর্যটন, আবাসন ও বাণিজ্যনির্ভর দুবাই সরাসরি বড় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়া এবং পর্যটক আগমন হ্রাস পাওয়ায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বুর্জ আল আরবের এই ১৮ মাসের সংস্কারকালকে হোটেল কর্তৃপক্ষ একদিকে আধুনিকায়নের সুযোগ হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার জন্য একটি ‘বাফার সময়’ হিসেবেও বিবেচনা করছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে দুবাইসহ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের পর্যটননির্ভর অর্থনীতি আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।










