মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে টানা দ্বিতীয় রাতের মতো ইরানে বিমান হামলা স্থগিত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত থাকার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের ওপর পাল্টা হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছে ইরানও। তবে চলমান এই থমথমে পরিস্থিতির মধ্যেই কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন উত্তেজনা।
গত প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা এই সংঘাত সামলাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে কূটনৈতিক আলোচনা এবং অন্যদিকে সামরিক পদক্ষেপের পথ খোলা রাখছেন। তবে মার্কিন গোলাবারুদের মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসায় নতুন করে হামলা আপাতত স্থগিত রেখেছেন তিনি। গত শুক্রবার ওভাল অফিসে আয়োজিত এক জরুরি বৈঠকে প্যাট্রিয়ট মিসাইল ইন্টারসেপ্টর ও টমাহক ক্রুজ মিসাইলের পর্যাপ্ত মজুদের ঘাটতি এবং সামরিক অভিযানের ঝুঁকি সম্পর্কে ট্রাম্পকে সতর্ক করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। মূলত সামরিক সরঞ্জামের এই সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি হস্তক্ষেপরোধী অবস্থানের কারণেই ওয়াশিংটন আপাতত হামলায় বিরতি দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বন্ধের পর ইরানের সেনাসূত্রে জানা গেছে, মার্কিন অভিযানের জবাব দেওয়াই তেহরানের মূল কৌশল ছিল, তাই আক্রমণ বন্ধ থাকায় তারা আপাতত মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক অভিযান স্থগিত রেখেছে। একই সঙ্গে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয় স্বীকার করলেও এই জলপথ দিয়ে কোন কোন জাহাজ চলাচল করবে তা নির্ধারণের ক্ষমতা ও ফি দাবি করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, উত্তেজনা যেন আর না বাড়ে সে জন্য মধ্যস্থতাকারীরা নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আরও
এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে আগামী মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বিশেষ বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে ইরানি নেতাদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের যেকোনো ধরনের কূটনৈতিক সমঝোতার শক্ত বিরোধিতা করছেন তিনি। আগামী অক্টোবরে ইসরায়েলে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনের আগে ইরান ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে দৃশ্যমান সাফল্য দেখানোর তীব্র রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন নেতানিয়াহু। সে কারণে সোমবার ওয়াশিংটন রওনা হওয়ার আগে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। ট্রাম্প প্রশাসন যেখানে হরমুজ প্রণালি সচল রাখাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, সেখানে নেতানিয়াহু চান যুক্তরাষ্ট্র যেন তেহরানের পারমাণবিক ও ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর মূল নজর বজায় রাখে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই মারমুখী অবস্থানের মাঝেই কাস্পিয়ান সাগরে নতুন সংঘাতের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে ইউক্রেন। সেখানে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে কিয়েভের দূরপাল্লার ড্রোন হামলায় এক ইরানি নাবিক নিহত ও অপর একজন আহত হয়েছেন। ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থা এসবিইউ দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা এসব জাহাজ ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম পারাপারে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও কাস্পিয়ান সাগরে সামরিক মালামাল বহনকারী জাহাজ ও যুদ্ধজাহাজে সফল অভিযানের কথা নিশ্চিত করেছেন। তবে এই আক্রমণকে বৈরী ও অপরাধমূলক আখ্যা দিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ইরান। তেহরানে নিযুক্ত ইউক্রেনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করার পাশাপাশি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কাল্লাসের সঙ্গে কথা বলে এই হামলার বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।









