মালদ্বীপ—নীল সমুদ্র আর বিলাসবহুল পর্যটনের এক অপরূপ দেশ। তবে এই চাকচিক্য ও সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো বাংলাদেশি শ্রমিকের ঘাম, কষ্ট আর অপূর্ণ স্বপ্নের এক করুণ গল্প। নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে যাঁরা দেশটির অবকাঠামো গড়েছেন, রিসোর্টগুলোকে প্রাণবন্ত করেছেন এবং মাছ ধরার জালে তুলে এনেছেন অর্থনীতির চাকা, তাঁদের অনেকেই আজ কাজহীন ও চরম অসহায়। একসময় যে প্রবাস জীবন তাঁদের কাছে রঙিন স্বপ্ন ছিল, আজ তা পরিণত হয়েছে এক কঠিন দুঃস্বপ্নে।
প্রবাসীদের বর্তমান বাস্তবতা অত্যন্ত মর্মান্তিক। প্রতিদিন সকালে কাজের সন্ধানে বের হয়ে শূন্য হাতে দিন শেষে ঘরে ফেরা এখন অনেকেরই নিয়তি। প্রবাসীদের অভিযোগ, আগে যেখানে কাজের কোনো অভাব ছিল না, এখন সেখানে নতুন নতুন শ্রমিকের আগমনে কাজের সুযোগ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ফলে এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতায় ছিটকে পড়ছেন অনেকে। দিনের পর দিন বেকার থেকে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন; পাশাপাশি ছোট্ট একটি রুমে গাদাগাদি করে থাকা, ধারদেনা করে চলা এবং দেশে থাকা পরিবারের দিকে তাকিয়ে অপরাধবোধে ভোগার মতো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন এই রেমিট্যান্স যোদ্ধারা।
কাজের অভাবের পাশাপাশি আরেকটি বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে মজুরি বৈষম্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়। যাঁরা কাজ পাচ্ছেন, তাঁরাও বলছেন যে জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও তাঁদের শ্রমের মূল্য একই জায়গায় আটকে আছে, ফলে সংসার চালানো রীতিমতো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছেন ‘ফ্রি ভিসা’র প্রলোভনে পড়ে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া দেশটিতে পাড়ি জমানো শ্রমিকেরা। সর্বস্ব হারিয়ে আইনি সুরক্ষা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা এই মানুষগুলোর জীবন এখন পুলিশের ভয় আর মালিকের শোষণে এক অনিশ্চয়তার অন্ধকার গলিতে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
আরও
এত সব বঞ্চনা ও অবহেলার পরও এই সংগ্রামী মানুষগুলো হার মানতে রাজি নন। দেশে থাকা পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর ‘আগামীকাল হয়তো একটি কাজ মিলবে’—এই আশায় তাঁরা প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের এই নীরব কান্না বা অদৃশ্য সংগ্রাম হয়তো অনেকেরই চোখের আড়ালে থেকে যাচ্ছে, অথচ এই মানুষগুলোর রক্তঘামেই গড়ে উঠছে মালদ্বীপের একেকটি বিলাসবহুল শহর ও স্বপ্নের দ্বীপ। তাই এখন সময় এসেছে এই স্বপ্নবাজ মানুষগুলোর দিকে ফিরে তাকানোর এবং তাঁদের ন্যূনতম সম্মান ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করার।










