সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটককে ব্যবহার করে প্রেমের ফাঁদ, অতঃপর সর্বস্ব লুটে নিয়ে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে নওগাঁর মান্দা উপজেলার এক তরুণী ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত তরুণীর নাম মারুফা আক্তার স্বপ্না। অভিযোগ উঠেছে, ভিডিও কলে প্রেমের অভিনয় ও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়াপ্রবাসী সোহেল রানার কাছ থেকে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। প্রতারণার শিকার হয়ে ওই তরুণীর সঙ্গে ভিডিও কলে থাকা অবস্থায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন ওই রেমিট্যান্স যোদ্ধা। মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে মান্দা উপজেলার মৈনম গ্রামে, যা নিয়ে এলাকাজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় ও ভুক্তভোগীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, মান্দার বৃম্মত্তপাড়ার সোহেল রানা জীবিকার তাগিদে ২০২২ সালে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান। সেখানে কুয়ালালামপুরের কাজাং এলাকায় ভালো বেতনে কর্মরত ছিলেন তিনি। এরই মধ্যে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে টিকটকার স্বপ্নার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ইমুতে নিয়মিত কথোপকথন ও প্রলোভনের একপর্যায়ে মোবাইল ফোনেই তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়, যেখানে চার লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, স্বপ্নার পরিবার গরুর খামার করার কথা বলে সোহেলের বোনের কাছ থেকে পাঁচ লাখ এবং সোহেলের কাছ থেকে আরও সাড়ে তিন লাখ টাকাসহ মোট সাড়ে আট লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। কিন্তু টাকা নেওয়ার কয়েক দিন পরই গত ৪ জুন স্বপ্না হঠাৎ করে সোহেলকে তালাকনামা পাঠিয়ে দেন।
তালাকনামা পেয়ে হতভম্ব সোহেল রানা ইমুতে কল করে স্বপ্নার কাছে কান্নাকাটি ও আকুতি-মিনতি করেন। সোহেলের বোন সাবিনা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা স্বপ্নার বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করলে তাঁদের সঙ্গেও চরম দুর্ব্যবহার করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, আকুতি জানানোর একপর্যায়ে স্বপ্না ওই প্রবাসীকে বারবার মরে যাওয়ার জন্য প্ররোচিত করেন। উপায়ান্তর না দেখে এবং প্রতারণার বিষয়টি সহ্য করতে না পেরে মালয়েশিয়ায় বসেই ইমুতে স্বপ্নাকে লাইনে রেখে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন সোহেল রানা। তবে অভিযুক্ত স্বপ্না এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে, তিনি আইন মেনে তালাক দিয়েছেন এবং এরপরের কোনো ঘটনার দায় তাঁর নয়। যদিও তাঁর দেখানো কাগজপত্রে বিয়ের তারিখ নিয়ে ব্যাপক অসংগতি পাওয়া গেছে।
আরও
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মৈনম ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকায় টিকটক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেন্দ্রিক একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। এই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন প্রবাসীর নম্বর সংগ্রহ করে তরুণীদের মাধ্যমে প্রেমের ফাঁদ পাতে। স্বপ্নার বিরুদ্ধে এর আগেও কাতারপ্রবাসী লুৎফর রহমান নামের এক যুবককে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করে ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। টাকা আদায়ের পরদিন তাঁকেও তালাকনামা পাঠিয়েছিলেন তিনি। এ ছাড়া উজ্জ্বল নামের আরেক তরুণের কাছ থেকেও ব্ল্যাকমেইল করে তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর সালিসের মাধ্যমে কিছু টাকা ফেরত দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। সম্মানহানির ভয়ে অনেক ভুক্তভোগীই মুখ খুলতে চান না বলে এই চক্রটি নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রবাসীদের টার্গেট করে এই ধরনের সাইবার প্রতারণা ও আত্মহত্যার প্ররোচনার ঘটনায় মান্দার সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাঁরা এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত স্বপ্না, তাঁর পরিবার ও অন্যান্য সদস্যের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন, যেন আর কোনো রেমিট্যান্স যোদ্ধাকে এভাবে জীবন দিতে না হয়। এ বিষয়ে মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. খোরশেদ আলম জানান, বিষয়টি তাঁরা অবগত হয়েছেন। তবে ভিকটিমের মরদেহ এখনো দেশে এসে পৌঁছায়নি। আইনি প্রতিকার পেতে ভুক্তভোগীর পরিবারকে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।










