ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার ও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে হাজারো তরুণ-তরুণীর বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী নয়াদিল্লি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিছক মজা করে শুরু হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’ নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ এখন দেশটির অন্যতম প্রধান তরুণ আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপ কয়েক মাস আগে উদ্যোগটি শুরু করলেও, বর্তমানে এটি ভারতজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। গত ১৯ জুলাই সংসদ অভিমুখে দলটির ডাকা পদযাত্রায় দিল্লিতে হাজারো মানুষ অংশ নেন। এর পাশাপাশি মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও গোয়াসহ বিভিন্ন শহরেও বিক্ষোভ ও মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচি পালিত হয়। মূলত ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে ব্যঙ্গ করেই এই প্রতীকী নামটি বেছে নিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
আন্দোলনকারীদের মূল ক্ষোভ দেশজুড়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ও কর্তৃপক্ষের চরম অব্যবস্থাপনা নিয়ে। বিশেষ করে এ বছর প্রায় ২২ লাখ ৮০ হাজার শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত চিকিৎসা শিক্ষার ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং পরবর্তীতে তা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তে চরম হতাশা তৈরি হয়। সিজেপির দাবি, এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপে অন্তত ২০ জন পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তাই গোটা শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনড় তাঁরা। গত ২৮ জুন দিল্লির যন্তর মন্তরে সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক অনশন শুরু করলে এই আন্দোলন আরও বেগবান হয়। পুলিশ তাঁকে জোরপূর্বক হাসপাতালে ভর্তি করলেও, সেখানে বসেই তিনি অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন, যা তরুণদের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে।
দিল্লির রাজপথে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন এখন আর কেবল নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ক্রমশ একটি বৃহত্তর সরকারবিরোধী রূপ নিচ্ছে। সোমবারের (২০ জুলাই) ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিতে পুলিশের লাঠিচার্জ ও সংঘর্ষের পর ছয়টি মামলা দায়ের হলেও সিজেপি তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যেই প্রস্তাবিত ভারত–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে শত শত কৃষক তাঁদের গবাদিপশু নিয়ে দিল্লির দিকে রওনা হয়েছেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে পাঞ্জাবের শিখ সম্প্রদায়সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাজারো মানুষ সরকারি নানা বাধা পেরিয়ে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস বুধবার (২২ জুলাই) জানিয়েছেন, শুরু থেকেই তাঁরা সংলাপের পক্ষে। সরকার চাইলে তাঁরা আলোচনায় বসতে রাজি আছেন, তবে তা কোনো সরকারি দপ্তরে নয়, যন্তর মন্তরের মতো কোনো নিরপেক্ষ স্থানে হতে হবে।
আরও
শিক্ষার্থীদের এই গণজাগরণ এরই মধ্যে ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জোরালো সমর্থন আদায় করে নিয়েছে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ও বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে গণতন্ত্রের ওপর আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন জোটের সংসদীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়েছেন, প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় সরকার ইতিমধ্যে ১৩ জনকে গ্রেপ্তারসহ দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা নিয়েছে। দোষীদের সর্বোচ্চ আইনি শাস্তির আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই পুনরায় পরীক্ষা নিয়ে দ্রুত ফল প্রকাশ করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও নেপালে ঘটে যাওয়া ‘জেন-জি’ বা নতুন প্রজন্মের গণঅভ্যুত্থান থেকে সরাসরি অনুপ্রেরণা নিয়েই ভারতের এই তরুণ সমাজ নিজেদের অধিকার আদায়ে রাজপথে নেমেছে।










