Long Popup (2)
সর্বশেষ

প্রবাসীর সবচেয়ে বড় কষ্ট: প্রিয়জনকে শেষবারের মতো না দেখা

1 mrfu1ptcj1av1njProbashircityWebPopupUpdate

দূর থেকে দেখলে ইউরোপ মানেই এক মোহনীয় হাতছানি। ইউরোর ঝনঝনানি, নিয়মতান্ত্রিক জীবন আর জার্মানির ঝকঝকে চওড়া রাস্তাগুলো আমাদের চোখে এক রঙিন স্বপ্নের জাল বোনে। মনে হয়, সেখানে পৌঁছাতে পারলেই বুঝি জীবনের সব অপূর্ণতা এক নিমেষে ঘুচে যাবে। কিন্তু এই ঝলমলে বাস্তবতার ঠিক পেছনেই লুকিয়ে আছে এমন কিছু নির্মম সত্য, যা শুনলে যে কারও মন কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে। প্রবাসীরা বুকের ভেতর পাথর চাপা দিয়ে রাখলেও এই আড়ালে থাকা গল্পগুলো সহজে দেশের মানুষের সামনে প্রকাশ করতে পারেন না।

প্রবাসজীবনের প্রথম বড় ধাক্কাটা আসে আত্মসম্মানে। দেশে কেউ হয়তো বড় কর্মকর্তা ছিলেন, ছিল সামাজিক মর্যাদা বা উচ্চতর ডিগ্রি; কিন্তু জার্মানির মাটিতে পা রাখার পর শুরুতে সেসবের যেন কোনো মূল্যই থাকে না। একজন নতুন শিক্ষার্থী বা অভিবাসী হিসেবে অনেককেই রেস্তোরাঁয় থালাবাসন ধোয়া, সুপারশপে পণ্য গোছানো কিংবা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতে হয়। নিজের এত দিনের চেনা পরিচয় আর অহংকার দূরে সরিয়ে রেখে একদম শূন্য থেকে জীবন শুরু করার এই মানসিক সংগ্রাম সহ্য করা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না।

বিদেশের মাটিতে সবচেয়ে বড় যাতনার নাম ‘সোশ্যাল আইসোলেশন’ বা চরম একাকীত্ব। তীব্র জ্বরে বিছানায় পড়ে থাকলেও সেখানে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেওয়ার মতো কেউ পাশে থাকে না। পরিচিত মানুষেরা সবাই নিজের কাজ, পড়াশোনা আর যান্ত্রিক জীবনের ইঁদুরদৌড়ে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে, মাসের পর মাস কারও সঙ্গে মন খুলে দুটো কথা বলার ফুরসত মেলে না। দেশে বসে অনেকেই হয়তো এই একাকীত্বের কষ্ট শুনে হাসবেন, কিন্তু চার দেয়ালের ভেতরের এই নিস্তব্ধতা যে কতটা ভয়ংকর, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন।

আপনি যতই ভালোভাবে জার্মান ভাষা রপ্ত করুন না কেন, কিংবা নিখুঁতভাবে সেখানকার নিয়মকানুন মেনে চলুন—সমাজের একটি বড় অংশের কাছে আপনি সারা জীবন একজন ‘বিদেশি’ হয়েই থাকবেন। কর্মক্ষেত্রে বা দৈনন্দিন জীবনের নানা বাঁকে এমন কিছু সূক্ষ্ম বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়, যা মনকে বিষিয়ে তোলে। এই অদৃশ্য দেয়াল মেনে নিয়েই প্রবাসীদের প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রমাণ করার এক নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যেতে হয়।

তবে প্রবাসজীবনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও বুকভাঙা সত্যিটির মুখোমুখি হতে হয় তখন, যখন নিজের ক্যারিয়ার বা ভবিষ্যৎ গড়ার কঠিন লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকার সময় দেশে থাকা সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির চিরবিদায়ের খবর আসে। ইচ্ছা থাকলেও অনেক সময় ভিসা জটিলতা, আইনি কাগজপত্র কিংবা জরুরি ফ্লাইটের টিকিটের অভাবে শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখটা দেখার সুযোগ মেলে না। শেষ বিদায় জানাতে না পারার এই চিরস্থায়ী অপরাধবোধ একজন প্রবাসীকে সারা জীবন তাড়িয়ে বেড়ায়, যা কোনো ইউরো দিয়েই মুছে ফেলা সম্ভব হয় না।

এই রূঢ় বাস্তবতাগুলো তুলে ধরার উদ্দেশ্য কাউকে ভয় দেখানো নয়, বরং কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানসিকভাবে শক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া। জার্মানি বা ইউরোপের মাটি হয়তো ক্যারিয়ার ও আর্থিক সাফল্য দুহাত ভরে দেবে, কিন্তু এর বিনিময়ে কেড়ে নেবে ভেতরের আবেগ, উৎসবের আনন্দ আর পরিবারের সঙ্গে কাটানো সোনালি সময়গুলো। সাফল্যের পেছনের এই অন্ধকার দিক আর অপরিসীম ত্যাগ মেনে নেওয়ার মানসিক শক্তি থাকলেই কেবল ইউরোপের রঙিন স্বপ্ন দেখা মানায়।

আরও দেখুন

whatsappচ্যানেল ফলো করুন

প্রবাস টাইমে লিখুন আপনিও। প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটির নানা আয়োজন, ঘটনা-দুর্ঘটনা, প্রবাসীদের সুযোগ-সুবিধা, সমস্যা-সম্ভাবনা, সাফল্য, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের খবর, ছবি ও ভিডিও আমাদের পাঠাতে পারেন news@probashtime.com মেইলে।

ProbashircityWebPopupUpdate