চীনের ‘কৃত্রিম সূর্য’ বা নিউক্লিয়ার ফিউশন চুল্লি প্রকল্পে একটি বিশাল প্রকৌশলগত মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। দেশটির একাডেমি অব সায়েন্সেসের প্লাজমা ফিজিকস ইনস্টিটিউটে তৈরি সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বকগুলোর মূল পরীক্ষামূলক ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ৫২৮ টন ওজনের এই সুবিশাল সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বকটি মূলত চীনের নির্মাণাধীন ফিউশন চুল্লির অন্যতম প্রধান অংশ। সূর্যের কেন্দ্রের চেয়েও অধিক উত্তপ্ত প্লাজমাকে চুল্লির দেয়ালের সংস্পর্শ ছাড়াই শূন্যে ভাসিয়ে রাখতে বিশেষভাবে এর নকশা করা হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

চীনের এই ‘কৃত্রিম সূর্য’ মূলত একটি পরীক্ষামূলক চুল্লি। পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্যে খোদ সূর্যে চলমান পারমাণবিক ফিউশন প্রক্রিয়া পৃথিবীতে কৃত্রিমভাবে তৈরির জন্য এটি নির্মাণ করা হয়েছে। পারমাণবিক ফিউশন প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের মতো হালকা পরমাণুগুলো একত্রিত হয়ে ভারী পরমাণু তৈরি করে। এতে ফিশন প্রক্রিয়ার (যেখানে বড় নিউক্লিয়াস ভেঙে ছোট হয়) তুলনায় বহুগুণ বেশি শক্তি উৎপন্ন হয়। তবে প্রচণ্ড তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবর্তনশীল প্লাজমার কারণে ফিউশন থেকে শক্তি উৎপাদন অত্যন্ত জটিল একটি প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়।
আরও


সূর্যে ফিউশন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও পৃথিবীতে সেই মাত্রার মহাকর্ষ বল না থাকায় বিজ্ঞানীদের প্লাজমাকে প্রায় ১০ কোটি (১০০ মিলিয়ন) ডিগ্রি সেলসিয়াসে উত্তপ্ত করতে হয়। এই অতি উষ্ণ প্লাজমাকে ধরে রাখার মতো কোনো সাধারণ পদার্থ না থাকায় বিজ্ঞানীরা চৌম্বকক্ষেত্রের সাহায্যে একটি অদৃশ্য খাঁচা তৈরি করেন। এ কাজে ‘টোকামাক’ নামের ডোনাট আকৃতির ফিউশন চুল্লি ব্যবহার করা হয়, যার চারপাশে ১৬টি বিশাল ডি-আকৃতির সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বক সাজানো থাকে। ২১ মিটার দীর্ঘ, ১২ মিটার চওড়া এবং ৫৮২ টন ওজনের প্রতিটি চুম্বক এ যাবৎকালের নির্মিত সবচেয়ে বড় সুপারকন্ডাক্টিং ফিউশন চুম্বক। এগুলো টোকামাকের ভেতরে ৬ দশমিক ৫ টেসলা শক্তির চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে, যা পৃথিবীর নিজস্ব চৌম্বকক্ষেত্রের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী।
ফ্রান্সে অবস্থিত আন্তর্জাতিক ফিউশন গবেষণা প্রকল্প ‘ইটার’ (ITER)-এর চুম্বকের চেয়ে চীনের এই চুম্বক প্রায় তিন গুণ বেশি শক্তি সঞ্চয় করতে পারে এবং টানা ৬০ বছর কার্যকর থাকার উপযোগী করে এটি তৈরি করা হয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বকের প্রতিটি উপাদান সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে উৎপাদন করেছে চীন। ফলে বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর তাদের আর নির্ভর করতে হচ্ছে না। এর আগে চলতি বছরের শুরুর দিকে চীনের এক্সপেরিমেন্টাল অ্যাডভান্সড সুপারকন্ডাক্টিং টোকামাক ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১ হাজার ৬৬ সেকেন্ড পর্যন্ত প্লাজমা ধরে রেখে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিল। বাণিজ্যিকভাবে ফিউশন বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে মানবজাতি এখনো কিছুটা দূরে থাকলেও, ২০২৭ সালে ফিউশন চুল্লির পরীক্ষা শুরু করে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে চীন।










