দেশে প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দময় ছুটি কাটিয়ে মাত্র তিন দিন আগে হাসিমুখে ওমানের কর্মস্থলে ফিরেছিলেন। কে জানত, এই যাওয়াই হবে তার শেষ যাওয়া! দীর্ঘ ৪৬ বছরের প্রবাসজীবনের ইতি টেনে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন মো. আবদুর রাজ্জাক (৮১) নামের এক বর্ষীয়ান বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধা। বুধবার (২৯ অক্টোবর) ওমানের স্থানীয় সময় বিকেল ৪টার দিকে হঠাৎ স্ট্রোক করে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় তার। মাত্র কদিন আগে যে মানুষটিকে সুস্থ শরীরে বিদায় দেওয়া হয়েছে, তার এমন আকস্মিক মৃত্যুর খবরে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে পরিবার, স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে শোকের গভীর ছায়া নেমে এসেছে।
নিহত আবদুর রাজ্জাক চট্টগ্রামের হাটহাজারী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব দেওয়াননগর এলাকার লাল মিয়া হাজী বাড়ির মৃত আবদুল মালেকের ছেলে। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে এবং সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় ১৯৭৮ সালে জীবিকার সন্ধানে ওমানে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ এই প্রবাসজীবনে তিনি অনেক চড়াই-উতরাই পার করেছেন। নিজের সততা ও পরিশ্রমে ওমানের সোমাইল এলাকায় একটি গ্রিল ওয়ার্কশপের ব্যবসা দাঁড় করিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে এই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। বয়স আশির কোঠা পেরোলেও পরিবারের মায়ায় প্রবাসের মাটিতেই পড়ে ছিলেন এই সংগ্রামী মানুষটি।
সম্প্রতি দেশে এসে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দারুণ একটি ছুটি কাটিয়েছেন আবদুর রাজ্জাক। মৃত্যুকালে তিনি তিন ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। দেশে থাকাকালীন সন্তান ও স্বজনদের সঙ্গে তার চমৎকার সময় কেটেছে। ছুটি শেষে গত ২৫ অক্টোবর তিনি পুনরায় ওমানে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যান। পরিবারের সদস্যরা তাকে বিমানবন্দরে হাসিমুখে বিদায় জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বিদায়বেলার স্মৃতি মুছে যাওয়ার আগেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে এল তার নিথর দেহের খবর।
আরও
বুধবার ওমানে তার মৃত্যুর বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেন নিহতের ভাগিনা এবং হাটহাজারী প্রেস ক্লাবের সহসভাপতি সাংবাদিক মো. হোসেন। এছাড়া ওমানপ্রবাসী বাংলাদেশি নঈম উদ্দিন বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে মোবাইল ফোনে পরিবারের কাছে বিস্তারিত তথ্য জানান। তিনি জানান, বুধবার বিকেলে কর্মস্থলে থাকা অবস্থায় আবদুর রাজ্জাক হঠাৎ বুকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সহকর্মীরা দ্রুত তাকে চিকিৎসার জন্য স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ওমানের স্থানীয় সময় বিকেল ৪টার দিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। এর আগে বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মৃত্যুর প্রাথমিক খবরটি নিশ্চিত করেন নিহতের প্রতিবেশী মো. আলাউদ্দিন।
বর্তমানে আবদুর রাজ্জাকের নিথর মরদেহ ওমানের কোলা হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। একজন প্রবীণ ও সম্মানিত প্রবাসী হিসেবে স্থানীয় বাংলাদেশিদের মধ্যেও তার মৃত্যুতে শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। প্রবাসী নঈম উদ্দিন জানিয়েছেন, হাসপাতাল ও পুলিশের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। যে মানুষটি মাত্র কদিন আগে নিজের পায়ে হেঁটে দেশ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন, এখন সেই প্রিয় মানুষটির কফিনবন্দী লাশের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন হাটহাজারীর স্বজনেরা। তার এমন বিদায়ে পুরো গ্রামে এখন শুধুই আহাজারি।








