ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের লাগাতার আক্রমণ ও যুদ্ধক্ষেত্রে ধারাবাহিক পশ্চাদপসরণের মুখে গভীর কৌশলগত সংকটে পড়েছে সৌদি আরব। রণাঙ্গনে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীগুলোকে হটিয়ে হুথিরা এরই মধ্যে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দরসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি দ্বীপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। সীমানার ভেতরে ঢুকেও দক্ষিণ সৌদি আরবের বিভিন্ন সংবেদনশীল তেল স্থাপনা ও বিমানঘাঁটিতে নিয়মিত ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বিদ্রোহীরা। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহন ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান পথ বাবেল মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে চলে যাওয়ার এক বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা রিয়াদকে চরম ভাবিয়ে তুলেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং বাবেল মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রচলিত কূটনৈতিক রীতির বাইরে গিয়ে এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে রিয়াদ। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘ইসরায়েল হায়োম’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শর্তে অটল থাকা সৌদি আরব এবার পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা কামনা করেছে। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের মাধ্যমেই তেল আবিবের সঙ্গে এই জরুরি যোগাযোগ স্থাপন করেছে তারা। বিশ্লেষকদের ধারণা, হুথিদের এই ক্রমবর্ধমান হুমকি এবং ভূরাজনৈতিক এই চরম সংকটময় পরিস্থিতি রিয়াদ ও তেল আবিবকে কৌশলগতভাবে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসার পথ প্রশস্ত করতে পারে।
হুথিদের এই আগ্রাসন রুখতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সামরিক হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানালেও, ওয়াশিংটন সরাসরি কোনো নতুন যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে মিত্র দেশ হিসেবে তারা রিয়াদকে নিবিড় গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে মার্কিন সেন্টকমের প্রধান ব্র্যাড কুপার বর্তমানে সৌদি আরব সফর করছেন এবং পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। যুবরাজ সালমান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে বলেছেন, বাবেল মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বেহাত হলে বা নৌপথটি বন্ধ হয়ে গেলে সৌদির তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।
আরও
এই সংঘাতময় পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থানও এখন বেশ মেরুকৃত। লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের বাণিজ্যের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে মিসর এই সংকটে জোরালোভাবে সৌদি আরবের পাশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান ও তুরস্ক চলমান এই সংঘাতে সরাসরি কোনো সামরিক পদক্ষেপ না নিয়ে কেবল কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে ইয়েমেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে এক জটিল সামরিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব কেবল ওই অঞ্চলেই নয়, বরং পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর ব্যাপকভাবে পড়তে পারে।







