যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা দেশটির জন্য নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিনের মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। জানা গেছে, আমিরাতের ওপর ইরানের হামলার বিষয়ে পাকিস্তান জোরালো নিন্দা না জানানোয় আবুধাবি ক্ষুব্ধ হয়েছে। এর জের ধরেই পারস্য উপসাগরীয় দেশটি থেকে হঠাৎ করে ব্যাপক হারে পাকিস্তানি শ্রমিকদের বহিষ্কার করা শুরু হয়েছে, যা চরম অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তানের জন্য কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস বন্ধ হওয়ার বড় ধরনের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন এবং ভুক্তভোগীদের তথ্যমতে, গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই অনেক পাকিস্তানি শ্রমিককে গ্রেপ্তার, আটক এবং দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের শিয়া সম্প্রদায়ের শ্রমিকদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিয়া নেতাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতিতে পাকিস্তান ভূমিকা রাখার পরপরই এই বহিষ্কার শুরু হয়। সিআইডি পরিচয়ে সাদা পোশাকের কর্মকর্তারা কর্মস্থল থেকে শ্রমিকদের তুলে নিয়ে আটক কেন্দ্রে রাখছেন এবং পরে জরুরি ভ্রমণ নথি বা ‘আউটপাস’ দিয়ে দেশে ফেরত পাঠাচ্ছেন। অনেক শ্রমিকের নথিতে বহিষ্কারের কারণ হিসেবে কেবল ‘কারারুদ্ধ/পলাতক’ উল্লেখ করা হচ্ছে।
এই টানাপোড়েনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর। গত মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত পাকিস্তানকে দেওয়া ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ প্রত্যাহার করে নিয়েছে, যা ছিল পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। তবে এই শূন্যস্থান পূরণে তাৎক্ষণিকভাবে সৌদি আরব ৩ বিলিয়ন ডলার আমানত দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে এসেছে। এদিকে গণহারে পাকিস্তানি নাগরিকদের বহিষ্কারের কথা অস্বীকার করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, কেবল অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদেরই ফেরত পাঠানো হচ্ছে। অন্যদিকে, আমিরাত সরকার এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
আরও
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, আমিরাতে বসবাসকারী অন্যান্য দেশের শিয়া নাগরিকরা (যেমন ইরাকি বা লেবানিজ) নির্বাসনের সম্মুখীন না হওয়ায় এটি স্পষ্ট যে, এর পেছনে কেবল সাম্প্রদায়িকতার চেয়েও যুদ্ধ নিয়ে ইসলামাবাদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান বেশি দায়ী। আমিরাতে ২০ লাখেরও বেশি পাকিস্তানি কর্মরত, যারা গত বছর ৮০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। উপসাগরীয় অঞ্চলে সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান বিভেদের মাঝেও আটকা পড়েছে পাকিস্তান। একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের উষ্ণ সম্পর্ক এবং প্রতিরক্ষা চুক্তি, অন্যদিকে ইরানের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা—সব মিলিয়ে আমিরাত অসন্তুষ্ট হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে পাকিস্তান এখন বড় ধরনের উভসংকটে পড়েছে।







