পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে চোখ জ্বালা করে পানি পড়া, আর কষ্ট পেয়ে কান্না করা দুটি কি একই— এ নিয়ে মানুষের মধ্যে কৌতূহলের শেষ নেই। দেখতে একরকম মনে হলেও, আমাদের চোখের পানি আসলে ভিন্ন ভিন্ন কারণে তৈরি হয় এবং প্রতিটির কাজও আলাদা। চোখের যত্ন থেকে শুরু করে মানসিক চাপ কমানো সবকিছুতেই চোখের পানির ভূমিকা অনেক গভীর।
পেঁয়াজ কাটার সময় যে পানি বের হয় তা মূলত পানিনির্ভর, আর আবেগের সময় বের হওয়া চোখের পানিতে থাকে স্ট্রেস হরমোন ও প্রাকৃতিক ব্যথানাশক উপাদান। চোখের পানি আমাদের শরীরে প্রায় সবসময় তৈরি হয়। এটি চোখের ওপর একটি অদৃশ্য স্তর তৈরি করে, যা চোখকে সুরক্ষা দেয়। তবে আনন্দ, দুঃখ বা হাসির মতো তীব্র আবেগের সময় এই পানি বেশি পরিমাণে বের হয়ে আসে।
আরও
চোখের পানির ধরন: মানুষের চোখে মূলত তিন ধরনের পানি তৈরি হয়। যেমন- বেসাল, রিফ্লেক্স ও ইমোশনাল বা আবেগের পানি।
বেসাল: পানি সবসময় চোখকে ভেজা রাখে। এতে লাইজোজাইম নামের প্রোটিন থাকে, যা ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ করে এবং লিপিড থাকে যা চোখ শুকিয়ে যাওয়া ঠেকায়।
রিফ্লেক্স: পানি তৈরি হয় যখন চোখে কোনো জ্বালাপোড়া বা বিরক্তিকর কিছু ঢুকে পড়ে, যেমন- পেঁয়াজের গ্যাস বা ধোঁয়া। এটি দ্রুত বের হয়ে চোখ পরিষ্কার করে দেয় এবং এতে পানির পরিমাণ বেশি থাকে।
ইমোশনাল পানি: তৈরি হয় তীব্র আবেগের সময় দুঃখ, আনন্দ বা রাগে। এটি ধীরে বের হয় এবং এতে থাকে স্ট্রেস হরমোন যেমন- এসিটিএইচ এবং প্রাকৃতিক ব্যথানাশক যেমন- এনকেফালিন।
আসলে ধরন আলাদা হলে চোখের অশ্রুনালী একই। তবে রাসায়নিক গঠনে পার্থক্য রয়েছে।
চোখের পানি যেভাবে তৈরি হয়: চোখের ওপরের অংশে থাকা ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি থেকে চোখের পানি তৈরি হয়। স্নায়ুর মাধ্যমে এর নিয়ন্ত্রণ হয়। স্মিথসোনিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, চোখের কর্নিয়ায় কোনো জ্বালাপোড়া হলে সেন্সর তা শনাক্ত করে এবং ট্রাইজেমিনাল নার্ভ ল্যাক্রিমাল গ্রন্থিকে বেশি পানি তৈরি করতে নির্দেশ দেয়।
অন্যদিকে, আবেগজনিত পানি তৈরি হয় মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেম থেকে, যা আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ু ও অ্যাসিটাইলকোলিন কাজ করে, যা শরীরকে শান্ত করতে সাহায্য করে। বেসাল পানি আবার সহায়ক গ্রন্থির মাধ্যমে নিয়মিত তৈরি হতে থাকে, যাতে চোখ সবসময় সুরক্ষিত থাকে।
আবেগের কান্না আর পেঁয়াজ কাটার সময়ের চোখের পানি কি এক?
পেঁয়াজ কাটার সময় যে পানি বের হয়, তা মূলত রিফ্লেক্স পানি। এতে পানি বেশি, প্রোটিন কম এবং কোনো হরমোন থাকে না। ক্লিভল্যান্ড আই ক্লিনিকের মতে, ইমোশনাল পানিতে প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি প্রোটিন থাকে। এ ছাড়া, এতে প্রোল্যাকটিন, এসিটিএইচ এবং লিউ-এনকেফালিন নামের উপাদান থাকে, যা প্রাকৃতিকভাবে ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।
গবেষক উইলিয়াম ফ্রের গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের চোখের পানি শরীরের জমে থাকা চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। এমনকি বিভিন্ন আবেগের চোখের পানিও একে অপরের থেকে আলাদা। ২০১৩ সালে মার্কিন আলোকচিত্রী রোজ-লিন ফিশার ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে মানুষের ১০০ ধরনের চোখের পানির গঠন ধারণ করেন।
শুকিয়ে গেলে রিফ্লেক্স পানিতে সূচালো স্ফটিকের মতো গঠন দেখা যায়। আর ইমোশনাল পানিতে হরমোনের কারণে জৈব উপাদানের ঘূর্ণি দেখা যায়। দুটোই কিছুটা জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে, তবে আবেগের কান্নার সঙ্গে মুখ লাল হয়ে যাওয়া বা হাউমাউ করে কান্না করার মতো প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়। এটা মূলত মস্তিষ্কের আবেগের সঙ্গে জড়িত।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া










