ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির কড়া জবাব দিয়ে ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের আলোচনা হচ্ছে না। তবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় নির্বিঘ্ন করতে ওমানের সঙ্গে একটি অস্থায়ী নৌপথ তৈরির বিষয়ে নিবিড় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান। সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই অবস্থান পরিষ্কার করেন। এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, চলমান সংকট মেটাতে সোমবার থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের আলোচনা শুরু হতে পারে। এমনকি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অনুরোধে তিনি ইরানের ওপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক হামলা চালানো থেকে বিরত ছিলেন বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তবে ইরান এই দাবি উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছে, গত সাত-আট দিন ধরে চলা এই আলোচনাটি সম্পূর্ণ দ্বিপক্ষীয় এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে ইরান। এই নৌপথের ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার বিষয়ে তারা নিজেদের শর্তে অনড় রয়েছে। জাহাজ চলাচলে নানা সেবা দেওয়ার বিনিময়ে শুল্ক আদায়ের প্রস্তাবের পাশাপাশি ইরান ও ওমানের সমন্বয়ে একটি যৌথ প্রতিষ্ঠান তৈরির কথাও ভাবা হচ্ছে, যা তুলনামূলক কম খরচে বিমা সুবিধাসহ অন্যান্য সামুদ্রিক সেবা প্রদান করবে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, প্রণালির উত্তর দিকের পথ দিয়েই মূলত জাহাজগুলোকে চলাচল করতে হবে। সমান্তরাল দুটি পথ চালু রাখা বা কোনো তৃতীয় দেশকে এই নৌপথ থেকে মাইন সরানোর সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইসমাইল বাঘাই জানান, জাতিসংঘের পুরোনো পদ্ধতির বদলে এখন কেবল একটি নির্দিষ্ট করিডোর নিয়েই আলোচনা হচ্ছে, যা স্থায়ী পথ নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত অস্থায়ী বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
আরও
গত ১৮ জুন স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তগুলো বাস্তবায়নে হরমুজ প্রণালির এই সংকট এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রণালি দিয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নৌপথ চালু করা না গেলে চুক্তির অন্যান্য দিক কার্যকর করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে ইরান। এই মতানৈক্যের জেরেই মূলত লোহিত সাগর থেকে শুরু করে ইরাক পর্যন্ত নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত একটি নিরাপদ পথ নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হবে না। অন্যদিকে ইরানের নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘বিশেষজ্ঞ পরিষদ’ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কোনো ধরনের ভরসা না করার বিষয়ে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেও, দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই চুক্তিকেই ভবিষ্যতের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখছেন।
পুরো কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে সৌদি আরবের অত্যন্ত সতর্ক ও দ্বিমুখী অবস্থান। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাত্মক যুদ্ধ যেন ছড়িয়ে না পড়ে, সেই আশঙ্কা থেকেই রিয়াদ একদিকে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইরাক ও ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এদিকে ইউরোপীয় মিত্ররা যখন হরমুজ প্রণালির দক্ষিণাংশ থেকে মাইন সরানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল, তখন ইরান ও ইউরোপের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়। তেহরান এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডকে দায়ী করেছে। তাদের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্র জোরপূর্বক ওমানের জলসীমা দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধ্য করছে, যা এই অঞ্চলে উত্তেজনা আরও উসকে দিচ্ছে।











