হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিটি যে অবস্থায় ছিল, সেখানে আর ফিরে যাওয়া হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের সঙ্গে দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর আশা প্রকাশ করেছেন, ঠিক তখনই তেহরানের পক্ষ থেকে এমন ঘোষণা এল।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এসব কথা বলেন। মন্ত্রিসভায় দেওয়া এক প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, তেহরান ও মাসকাটের মধ্যে চলমান আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে। এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, হরমুজ প্রণালিতে বিদ্যমান নৌপথের বাইরে নতুন একটি সামুদ্রিক রুট নিয়ে তেহরান ও মাসকাট সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এমন একটি রুট নিয়ে সমঝোতা হতে যাচ্ছে যা উভয় পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য হবে। এটি বিদ্যমান উত্তর বা দক্ষিণ রুট হবে না; বরং এমন একটি পথ হবে, যা উভয় দেশের সার্বভৌম অধিকারকে সম্মান করার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। তবে এ বিষয়ে ওমানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালির দুই পাশেই ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমা রয়েছে। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশই এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। নতুন রুটের বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা না হলেও, সংঘাত শুরুর পর থেকে কার্যত এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেহরান প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। জুনে সাময়িক যুদ্ধবিরতি হলেও নৌপথ নিয়ে বিরোধের জেরে তা ভেঙে পড়ে এবং জুলাইয়ে আবারও সংঘাত শুরু হয়। ইসমাইল বাঘাইয়ের মতে, নতুন নৌপথ নিয়ে সমঝোতার সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খোলা বা বন্ধ থাকার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি প্রণালি বন্ধ হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধসহ নানা বৈরী পদক্ষেপকেই দায়ী করেন।
আরও
এদিকে রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারক ভবিষ্যতে তেহরানের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিপ্রস্তর হবে। প্রতিপক্ষ যেন চুক্তির শর্ত মেনে চলে, তা নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দেন। পাশাপাশি ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের মুখপাত্র হাসসাম গাশঘাভি জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারীরা জুনের সমঝোতা স্মারকটি পুনরায় কার্যকর করার চেষ্টা করছেন। চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে আবারও একটি ইরানি প্রতিনিধিদলের মাসকাট সফরের সম্ভাবনা রয়েছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, দ্রুত একটি চুক্তি হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে আর কোনো হামলা চালাবে না। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের অনুরোধে তিনি হামলা বাতিলের সিদ্ধান্তে সম্মত হয়েছেন। চুক্তির শর্ত হিসেবে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক হুমকির অবসানের কথা উল্লেখ করেন তিনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা নিয়ে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং তাঁকে এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আল-জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে সংঘাতের কথা বলছে, অন্যদিকে সমঝোতার সম্ভাবনার কথাও জানাচ্ছে। একইভাবে ইরানও দ্বিমুখী বার্তা দিচ্ছে। তেহরান একদিকে যেমন কূটনীতির পথ খোলা রাখার কথা বলছে, অন্যদিকে যেকোনো নতুন সংঘাতের জন্য নিজেদের পুরোপুরি প্রস্তুত থাকার হুঁশিয়ারিও দিয়ে রাখছে।









