যুদ্ধক্ষেত্রে অবিস্ফোরিত অবস্থায় পাওয়া অত্যাধুনিক মার্কিন ও ইসরায়েলি অস্ত্র এখন ইরানের সামরিক গবেষণাগারে। আর এ নিয়েই আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা ও গভীর উদ্বেগ। বিশ্লেষকদের মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এসব অস্ত্রের গোপন প্রযুক্তি ব্যবহার করেই কি ভবিষ্যতে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলবে তেহরান? ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সম্প্রতি হরমোজগান প্রদেশ থেকে অন্তত ১৫টি ভারী মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে, যার অনেকগুলোই যুদ্ধের সময় ইরানের ভূখণ্ডে পড়লেও বিস্ফোরিত হয়নি।
উদ্ধার হওয়া এসব অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত শক্তিশালী ‘জিবিইউ-৫৭ বাংকার বাস্টার’ বোমার মতো ধ্বংসাত্মক অস্ত্রও রয়েছে। প্রায় ১৩ হাজার কেজি ওজনের এই ভয়ংকর বোমা ১৮ মিটার পুরু কংক্রিট বা প্রায় ২০০ ফুট মাটি ভেদ করে মাটির নিচের গোপন বাংকার বা সুরক্ষামূলক স্থাপনায় অনুপ্রবেশ করে বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম। এর পাশাপাশি, ইরান টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, এজিএম-১৫৮ ক্ষেপণাস্ত্র এবং এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের গুরুত্বপূর্ণ অংশবিশেষও হস্তগত করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ইরানের কট্টরপন্থি সংবাদমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে যে, উদ্ধারকৃত এসব অস্ত্র বর্তমানে দেশটির সামরিক বাহিনীর কারিগরি ও গবেষণা ইউনিটের হাতে রয়েছে এবং সেগুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন নিশ্চিতভাবেই এসব অস্ত্রের ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ (প্রত্যাবর্তী প্রকৌশল) করার জোর চেষ্টা চালাবে; অর্থাৎ অস্ত্রগুলোর প্রতিটি অংশ খুলে এর নকশা ও কার্যপদ্ধতি বুঝে অবিকল নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করবে। সামরিক প্রযুক্তি চুরির এ ক্ষেত্রে তেহরানের অতীত সাফল্যও বেশ ঈর্ষণীয়। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক আরকিউ-১৭০ গোয়েন্দা ড্রোন প্রায় অক্ষত অবস্থায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সেই প্রযুক্তির আদলে নিজস্ব ড্রোন তৈরি করেছিল ইরান, যার প্রভাব বর্তমানে বিভিন্ন যুদ্ধে ব্যবহৃত ‘শাহেদ’ ড্রোনের প্রযুক্তিতেও স্পষ্ট। এছাড়া অতীতে মার্কিন ‘হক’ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি অনুসরণ করেও তারা সফলভাবে নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করেছিল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবারও যদি ইরান এই নতুন অস্ত্রগুলোর প্রযুক্তিগত কাঠামো আয়ত্ত করতে পারে, তবে ভবিষ্যতে মার্কিন হামলা ঠেকানো বা প্রতিরোধ করা তাদের জন্য অনেক সহজ হয়ে যাবে।
আরও
এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক সামরিক ভারসাম্যের জন্য এক অকল্পনীয় পরিবর্তন ডেকে আনতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ইরানের কট্টরপন্থি মহল থেকে এসব সংবেদনশীল অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত তথ্য রাশিয়া এবং চীনের মতো মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে ভাগাভাগি করারও প্রকাশ্য আহ্বান জানানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, এমনটা ঘটলে তা যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক প্রযুক্তির নিরাপত্তা ঢেলে সাজাতে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত অস্ত্রের সুরক্ষায় নতুন কৌশল গ্রহণে বাধ্য করবে। এদিকে, গোটা পরিস্থিতি নিয়ে উপহাস করে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক উপস্থাপক সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, অবিস্ফোরিত এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে একদিন ‘উপহার’ হিসেবেই শত্রুদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে; যা কার্যত এই বার্তাই দিচ্ছে যে ভবিষ্যতে প্রতিপক্ষের তৈরি অস্ত্র দিয়েই হয়তো তাদের মোকাবিলা করবে তেহরান।








