যুক্তরাজ্যে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন পাস হওয়া একটি আইন অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি বা তার পর জন্ম নেওয়া যেকোনো ব্যক্তির কাছে সিগারেট বা তামাকজাত পণ্য বিক্রি করা চিরতরে অবৈধ বলে গণ্য হবে। গত প্রায় দুই দশক ধরে দেশটিতে ১৮ বছরের কম বয়সীদের কাছে সিগারেট বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, নতুন এই ‘প্রজন্মভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা’র ফলে আগামী ২০২৭ সালের প্রথম দিনে যাদের বয়স ১৭ বছর বা তার কম থাকবে, তারা আইনিভাবে আর কখনোই তামাকজাত পণ্য কেনার সুযোগ পাবেন না। ব্রিটিশ সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপ মূলত দেশটিকে তামাকের সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল।
প্রজন্মভিত্তিক তামাক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যই অবশ্য বিশ্বের প্রথম বা একমাত্র দেশ নয়। এর আগে গত নভেম্বরে মালদ্বীপ একই ধরনের আইন প্রণয়ন করেছে এবং ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ড এমন একটি আইন পাস করলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে পরে তা বাতিল হয়ে যায়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে তামাক নীতি মূলত উচ্চহারে কর বসানো ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ‘অনিচ্ছাসত্ত্বেও সহ্য করা’র মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ম্যাসাচুসেটসের ব্রুকলিন শহরসহ অন্তত ২২টি স্থানীয় জনপদে এমন নিষেধাজ্ঞা পাস হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তামাক নিষিদ্ধ হওয়ার এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং কয়েক দশক ধরে চলা আইনি কড়াকড়ির মাধ্যমে ধূমপানকে সামাজিকভাবে ‘খারাপ কাজ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করারই একটি চূড়ান্ত পরিণতি। এই ধারণা ভবিষ্যতে সোশ্যাল মিডিয়া বা জুয়ার অ্যাপের মতো অন্যান্য আসক্তিমূলক পণ্যের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।
দীর্ঘদিনের নীতিগত পরিবর্তন কীভাবে সামাজিক রূপান্তর ঘটায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তামাকবিরোধী ইতিহাস তার একটি বড় প্রমাণ। ১৯৭৪ সালে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ ধূমপায়ী ছিলেন, পরবর্তী অর্ধশতাব্দীতে তা ধারাবাহিকভাবে কমে বর্তমানে প্রতি ১০ জনে একজনে নেমে এসেছে। ১৯৬৪ সালে ক্যানসারের সতর্কবার্তা, বিজ্ঞাপনে নিষেধাজ্ঞা, ‘পরিচ্ছন্ন বায়ু’ আইন এবং নব্বইয়ের দশকে তামাক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ঐতিহাসিক আইনি সমঝোতার মাধ্যমে ধূমপানকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এই ধারাবাহিক প্রচার ও নিয়ন্ত্রণের সাফল্যের কারণেই বর্তমানে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করার মতো মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এমনকি ২০২৩ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকানদের একটি বড় অংশই এখন সব ধরনের তামাকজাত পণ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পক্ষে।
আরও
যুক্তরাজ্যের এই ঐতিহাসিক নীতি সার্বিক ক্ষতি কমাতে শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা নিয়ে অবশ্য এখনো সংশয় রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আইনিভাবে তামাক কেনা নিষিদ্ধ হলেও তরুণরা হয়তো ২০০৯ সালের আগে জন্ম নেওয়া কোনো বয়স্ক বন্ধুর সহায়তায় বা কালোবাজারি থেকে অবৈধ উপায়ে তা সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে, যা নতুন করে অপরাধের জন্ম দিতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে ধূমপানজনিত চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা সরাসরি করদাতাদের ওপর পড়ায় এমন কঠোর আইন যৌক্তিক মনে হলেও, যুক্তরাষ্ট্র তাদের পুরোপুরি অনুসরণ করবে কি না তা নিশ্চিত নয়। কারণ, আমেরিকানরা ব্রিটিশদের তুলনায় অনেক বেশি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাসী এবং সরকারের অতি-নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকাণ্ডকে সন্দেহের চোখে দেখে থাকেন। তাই এই নিষেধাজ্ঞার প্রকৃত সুফল বা কুফল মূল্যায়ন করতে আরো দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার প্রয়োজন।









