ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে অনাহার ও তৃষ্ণায় ১১ বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে এই ট্র্যাজেডির শিকার হন তাঁরা। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আটজনই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। এ ঘটনায় ভাসমান অবস্থা থেকে ৩০ জনকে জীবিত উদ্ধার করে মিসরের উপকূলে নেওয়া হয়েছে, যাঁদের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
গতকাল রোববার (১৬ আগস্ট) মিসর উপকূল থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানান, খাবার ও পানির অভাবে চোখের সামনেই তাঁদের সঙ্গীদের মৃত্যু হয়েছে। পরে মরদেহে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়ালে বাধ্য হয়ে সেগুলো সাগরে ফেলে দেন তাঁরা। জানা যায়, গত ৩ আগস্ট রাতে ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা যাত্রা শুরু করে। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ওই নৌকায় থাকা যাত্রীদের মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি।

আরও
জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানান, যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পরই নৌকাটি ঝড়ের কবলে পড়ে। এতে তাঁদের কাছে থাকা খাবার ও পানির মজুত সাগরে ভেসে যায়। এরপর বাধ্য হয়ে খাবার ও পানি ছাড়াই বিপজ্জনক ওই যাত্রা অব্যাহত রাখেন তাঁরা। কিন্তু গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর হঠাৎ নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায় এবং সেটি গন্তব্যহীনভাবে সাগরে ভাসতে থাকে। এভাবে টানা নয় দিন ভূমধ্যসাগরে ভেসে থাকার পর বাতাসের তোড়ে নৌকাটি মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছালে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের উদ্ধার করে। পরে ১৮ বাংলাদেশিকে মারসা মাতরুহ সাধারণ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের আবদুল হেকিমের ছেলে আবদুল করিম ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, গ্রিসের কাছাকাছি যাওয়ার পর ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাঁরা আর সামনে এগোতে পারেননি। এ সময় তাঁদের উদ্ধার করতে দালাল চক্র বা অন্য কোনো সংস্থাও এগিয়ে আসেনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে খাবার বা পানি কিছুই ছিল না। এর অভাবেই চোখের সামনে নয়জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। বাধ্য হয়ে তাঁদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয়েছে। পরে আরও দুজনের মৃত্যু ঘটে।’ দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে তাঁদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে পচন ধরেছে বলেও জানান তিনি। দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে এই তরুণ বলেন, চিকিৎসকেরা ভালো সেবা দিচ্ছেন, কিন্তু তাঁরা এখন দেশে ফিরতে চান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সুনামগঞ্জের যে আট যুবক রয়েছেন তাঁরা হলেন—দিরাই পৌরসভার ঘাগটিয়া গ্রামের সানোয়ার রহমান, জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের বাগময়না গ্রামের জুয়েল আহমদ টিপু ও গন্ধর্বপুর গ্রামের হাবিব উল্লাহ এবং শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা শত্রুমর্দন গ্রামের হৃদয় পাল, চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খাঁন, রিপন মিয়া, মামুন খাঁন ও রনসী গ্রামের মো. তালহা।
এ বিষয়ে মিসরে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের বিষয়ে মারসা মাতরুহ সাধারণ হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্থানীয় পুলিশ স্টেশনের এক কর্মকর্তার সঙ্গে দূতাবাসের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। স্থানীয় পুলিশ দূতাবাসকে জানিয়েছে, মোট ৩০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং এর মধ্যে ১৮ জনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের জাতীয়তা সম্পর্কে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করেনি। আহত বাংলাদেশিরা সুস্থ হয়ে উঠলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে তাঁদের দ্রুত দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছে দূতাবাস।
এদিকে সুনামগঞ্জের যুবকদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. অলিউল্লাহ জানান, এ বিষয়ে কেউ থানায় কোনো তথ্য বা অভিযোগ দেননি। শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিল্লোল চাকমা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবরটি ছড়িয়ে পড়লেও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর (বিএমইটি) মাধ্যমে জেলার চারজন মিসরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার বিষয়টি জানা গেছে। এর আগে গত ২৮ মার্চ লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ১২ তরুণের একইভাবে মৃত্যু হয়েছিল। ওই ঘটনায় পরে জগন্নাথপুর থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়।












