রাস্তায় হঠাৎ একটি সাপ দেখলেই যেখানে সাধারণ মানুষ ভয়ে শিউরে ওঠেন, সেখানে একসঙ্গে যদি লাখো সাপের নড়াচড়া দেখা যায়, তবে দৃশ্যটি কতটা ভয়ংকর হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, পৃথিবীতে এমন একটি জায়গা রয়েছে যেখানে প্রতি বছর এই অসংখ্য সাপের অদ্ভুত মিলনমেলা দেখতে হাজারো মানুষ ভিড় করেন। কানাডার ম্যানিটোবা প্রদেশের নারসিস শহরটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সাপের ‘হানিমুন স্পট’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। প্রতি বসন্তে এই এলাকায় ৭৫ হাজারেরও বেশি লাল ডোরাকাটা ইস্টার্ন গার্টার সাপ জড়ো হয়, যার সংখ্যা অনেক সময় দেড় লাখও ছাড়িয়ে যায় বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।
দীর্ঘ ও তীব্র শীত শেষে সাধারণত মার্চ থেকে জুনের মধ্যে প্রকৃতির এই বিরল ও রোমাঞ্চকর আয়োজন শুরু হয়। পুরো শীতকালজুড়ে এই সাপগুলো ভূগর্ভস্থ চুনাপাথরের গুহায় নিরাপদে আশ্রয় নিয়ে থাকে। আবহাওয়া উষ্ণ হতে শুরু করলে প্রথমে পুরুষ সাপগুলো গুহা থেকে বেরিয়ে আসে এবং স্ত্রী সাপের সন্ধানে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর স্ত্রী সাপগুলো বেরিয়ে এলে এক বিস্ময়কর দৃশ্যের অবতারণা হয়। শত শত পুরুষ সাপ তখন একটিমাত্র স্ত্রী সাপকে ঘিরে ধরে মিলনের চেষ্টা চালায়। বিজ্ঞানীদের পরিভাষায় সাপের এই অদ্ভুত আচরণকে ‘মেটিং বল’ বলা হয়, যা দূর থেকে দেখলে মাটির ওপর বিশাল কোনো জীবন্ত সাপের গোলক নড়াচড়া করছে বলে মনে হয়।
প্রতি বছর সাপের এই অদ্ভুত ও বিরল আচরণ স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য জীববিজ্ঞানী ও গবেষক নারসিসে ছুটে যান। একই সঙ্গে রোমাঞ্চপ্রিয় প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের কাছেও জায়গাটি বর্তমানে অন্যতম প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। তবে বিপুলসংখ্যক এই সাপের নিরাপদ চলাচল নিয়ে আগে বেশ উদ্বেগ ছিল। অতীতে নারসিস এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্যস্ত মহাসড়কে যানবাহনের চাকায় পিষ্ট হয়ে অসংখ্য সাপ মারা যেত। এই প্রাণহানি রোধে পরবর্তীতে পরিবেশবিদদের উদ্যোগে মহাসড়কের নিচে সাপের নিরাপদ পারাপারের জন্য বিশেষ টানেল এবং সুরক্ষা বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে, যার ফলে বর্তমানে দুর্ঘটনার হার অনেকটাই কমে এসেছে।
আরও
বিশেষজ্ঞদের মতে, কানাডার নারসিস শহরের এই বিশাল সাপ সমাবেশ নিছকই কোনো অদ্ভুত প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; বরং এটি পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একই সঙ্গে সাপের আচরণ, প্রজনন প্রক্রিয়া এবং বাস্তুতন্ত্র নিয়ে বিস্তর গবেষণার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের সামনে এটি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তথ্যের দুয়ার উন্মোচন করছে। প্রকৃতির এই অদ্ভুত খেয়াল একদিকে যেমন পর্যটনের বিকাশ ঘটাচ্ছে, তেমনি প্রাণিবিদ্যা ও পরিবেশ গবেষণায় রাখছে অনবদ্য অবদান। (সূত্র: নিউজ এইটিন)










