দরিদ্র দর্জি বাবা যখন কাঁপা হাতে মেয়ের গলায় একের পর এক ১৭টি স্বর্ণপদক পরিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর চোখ বেয়ে ঝরছিল বাঁধভাঙা আনন্দাশ্রু। অভাবের সঙ্গে আজন্ম লড়াই করা এই দর্জির মেয়ে কান্দিল মুর্তজা শুধু ডাক্তারই হননি, বরং মেধার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে পাকিস্তানের খাইবার গার্লস মেডিকেল কলেজের ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। সমাবর্তন মঞ্চে যখন এই অভাবনীয় দৃশ্য রচিত হচ্ছিল, তখন আবেগে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো মিলনায়তন; এ যেন কেবল এক শিক্ষার্থীর সাফল্য নয়, বরং এক অদম্য পিতার আজীবন সংগ্রামের শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ‘পাকিস্তান টুডে’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরিপুরের কৃতী শিক্ষার্থী কান্দিল মুর্তজা এমবিবিএস প্রোগ্রামে রেকর্ডসংখ্যক ১৭টি স্বর্ণপদক জিতে এই অসামান্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। সম্প্রতি পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত কলেজের ২০২৬ সালের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তাঁর এই অনন্য সাধারণ একাডেমিক কৃতিত্বের জন্য তিনি ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সোহেল আফ্রিদি কান্দিলের হাতে পদকগুলো তুলে দিচ্ছেন, আর তাঁর পাশে পরম মমতায় ও গর্বে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন পিতা। কলেজের দীর্ঘ ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থীর অর্জিত এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যক স্বর্ণপদকের রেকর্ড।
ওই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কান্দিল ছাড়াও অন্যান্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মানিত করা হয়, যাদের মধ্যে মুকাদ্দাস ১০টি এবং সাবিহ ৭টি স্বর্ণপদক লাভ করেন। তবে কান্দিলের এই আকাশছোঁয়া সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাঁর পরিবারের অপরিসীম শিক্ষানুরাগ ও কঠোর অধ্যবসায়। গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে কান্দিলের বাবা তাঁদের পরিবারের শিক্ষাগত সাফল্যের কথা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি জানান, কান্দিলের এক বোন বর্তমানে খাইবার মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত এবং অন্য এক বোন ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সিতে (এফআইএ) গ্রেড-১৭ অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া তাঁর তৃতীয় কন্যা পিএইচডি শেষ করে বর্তমানে ইসলামাবাদে কর্মরত আছেন এবং তাঁদের একমাত্র ছেলেও একজন গ্র্যাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ার।
আরও
হাজারো প্রতিকূলতা ও দারিদ্র্যকে জয় করে কান্দিল মুর্তজা ও তাঁর ভাইবোনদের এই অভাবনীয় সাফল্য বর্তমানে অনলাইন জগতে ব্যাপক প্রশংসার জোয়ার সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেটিজেনরা এই দর্জি পরিবারের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সশ্রদ্ধ কুর্নিশ জানাচ্ছেন। অনেকেই কান্দিলের একাগ্রতা, অসামান্য মেধা এবং সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে তাঁর দরিদ্র পিতার সীমাহীন ত্যাগ ও আজীবন সংগ্রামের ভূয়সী প্রশংসা করছেন। এই ঘটনাটি গোটা বিশ্বের সামনে আবারও প্রমাণ করেছে যে, মেধা ও অধ্যবসায় থাকলে দারিদ্র্য কখনোই সফলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।










