উন্নত জীবনের আশায় নির্মাণশ্রমিকের কাজ নিয়ে রাশিয়া গিয়ে দালালের চরম প্রতারণার শিকার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে যেতে বাধ্য হয়েছেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মালিয়াট ইউনিয়নের গয়েশপুর গ্রামের ২২ বছর বয়সী তরুণ রাজন হোসেন। পরিবারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্ন নিয়ে চলতি বছরের ৭ মে দেশ ছাড়লেও তাঁকে জোরপূর্বক পাঠানো হয় রুশ সেনাবাহিনীর হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে। সেখানে প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হয়ে কোমরের নিচ থেকে শক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। এরপর বাঁচার তাগিদে টানা চার দিন বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কোনোমতে একটি রুশ সেনা ক্যাম্পে পৌঁছান। দীর্ঘ চিকিৎসা ও নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় গত ২৩ আগস্ট ক্রাচে ভর দিয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরেছেন এই তরুণ।
রাজনের বর্ণনামতে, মস্কো পৌঁছানোর পর আরও ৩০ জন বাংলাদেশির সঙ্গে তাঁকে বাসে করে ওরেনবুর্গে নিয়ে বিভিন্ন কাগজে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এরপর কাজের কথা বলে তাঁদের একটি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে গেলে তাঁরা যুদ্ধের বিষয়টি বুঝতে পারেন। ইগর ও জুলিয়া নামের দুই রুশ ব্যক্তির কাছে যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে পা ধরে অনুনয় করলেও তাঁদের জোর করে বাংকারে নেওয়া হয় এবং ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়। রাজন জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ জন বাংলাদেশি নিহত হন এবং তাঁর কোমরে আঘাত লাগে। আহত অবস্থায় চার দিন পর রুশ ক্যাম্পে পৌঁছালেও তাঁকে চিকিৎসা না দিয়ে উল্টো নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিনা চিকিৎসায় তিন দিন ফেলে রাখার পর তাঁকে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের একটি হাসপাতালে এবং পরে রাশিয়ার অন্য একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়।
রাশিয়ার ওই হাসপাতালে এক হৃদয়বান নারী চিকিৎসকের কাছে পুরো ঘটনা খুলে বললে তাঁরই সহযোগিতায় রাজন বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। দূতাবাসের হস্তক্ষেপে প্রয়োজনীয় ট্রাভেল ডকুমেন্ট নিয়ে দেশে ফেরার সুযোগ পান তিনি। এদিকে ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে ধারদেনা করে আট লাখ ৩০ হাজার টাকা স্থানীয় একতারপুর গ্রামের দালাল লেন্টু হোসেনের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন রাজনের বাবা আবদুল কাদের। অভিযুক্ত লেন্টু প্রতারণার বিষয়টি অস্বীকার করে সরকারিভাবে পাঠানোর দাবি করলেও রাজনের পরিবার দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদ সাধারণ মানুষকে দালালদের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে রাজনের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছাড়া রাজন এখন ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটেন, যা তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া এক ভয়ংকর প্রতারণারই নিষ্ঠুর বাস্তবতার সাক্ষী।









