আধুনিক বিশ্বে সৌন্দর্যের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে মেদহীন ও ছিপছিপে শরীরকে বিবেচনা করা হলেও পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ায় দেখা যায় এর সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। দেশটির দক্ষিণ ওমো ভ্যালি অঞ্চলে বসবাসকারী ‘বোডি’ নামক একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পুরুষের বড় আকৃতির ভুঁড়িই হলো শক্তি, সৌন্দর্য ও পরম মর্যাদার প্রতীক। এই জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস অনুযায়ী, যে পুরুষের ভুঁড়ি যত বড়, নারীদের কাছে তিনি ততটাই আকর্ষণীয় এবং সমাজে তিনি বীরের সম্মান পেয়ে থাকেন। এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই প্রতিবছরের জুন মাসের কাছাকাছি সময়ে বোডি সমাজে ‘কা’ইল’ বা ‘মোটা পুরুষদের অনুষ্ঠান’ নামের একটি ঐতিহ্যবাহী নববর্ষ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, যার মূল আকর্ষণ হলো অবিবাহিত তরুণদের টানা ছয় মাসব্যাপী ওজন বাড়ানোর এক চরম প্রতিযোগিতা।

এই কা’ইল উৎসব উপলক্ষে বোডি জনগোষ্ঠীর প্রতিটি পরিবার তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য একজন করে অবিবাহিত তরুণকে নির্বাচন করে এবং টানা ছয় মাস সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে একটি নির্দিষ্ট কুঁড়েঘরে রাখে। এ সময় যেকোনো ধরনের শারীরিক পরিশ্রম ও কুঁড়েঘর থেকে বের হওয়া তাদের জন্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থাকে এবং তাদের কঠোর যৌনসংযম পালন করতে হয়। দ্রুত ওজন বাড়ানোর জন্য এই দীর্ঘ ছয় মাস তাদের প্রধান খাবার থাকে তাজা গরুর রক্ত ও দুধের বিশেষ মিশ্রণ। বোডিরা গবাদিপশুকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করায় কোনো পশুকে হত্যা না করে বিশেষ উপায়ে গরুর শিরার ক্ষুদ্র অংশে ছিদ্র করে রক্ত সংগ্রহ করে। ফরাসি আলোকচিত্রী এরিক লাফোগিউয়ের মতে, অতিরিক্ত তরল পানের কারণে অনেক প্রতিযোগী তীব্র শারীরিক অস্বস্তি অনুভব করলেও সমাজের চূড়ান্ত সম্মান অর্জনের আশায় তারা এই যন্ত্রণা হাসিমুখে মেনে নেন।
আরও
টানা ছয় মাসের এই কঠোর তপস্যা শেষে কা’ইল উৎসবের দিন তরুণেরা গায়ে কাদা ও ছাই মেখে এবং মাথায় উটপাখির পালকের মুকুট পরে নিজেদের বিশাল মেদ-ভুঁড়ি নিয়ে জনসমক্ষে আসেন। উৎসব প্রাঙ্গণে একটি পবিত্র গাছকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃত্তাকারে হাঁটতে হয় এবং গোত্রের বয়োবৃদ্ধরা তাদের শারীরিক গঠন পর্যবেক্ষণ করে চূড়ান্ত বিজয়ী নির্বাচন করেন। এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী পুরুষ কোনো আর্থিক বা বস্তুগত পুরস্কার না পেলেও বোডি সমাজে তিনি সারা জীবনের জন্য ‘বীর’ বা ‘নায়ক’ উপাধি লাভ করেন এবং নারীদের কাছে জীবনসঙ্গী হিসেবে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পান। তবে অত্যন্ত রক্ষণশীল এই বোডি সমাজের অনন্য কা’ইল উৎসব ও ভুঁড়ি বাড়ানোর এই শতবর্ষী ঐতিহ্যটি আধুনিক নগর সভ্যতা ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবে বর্তমানে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে।











