সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোটগ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে জোর আলোচনা চলছে। গাজা, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে বহুমুখী যুদ্ধ, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যর্থতা এবং সরকারের বিতর্কিত নানা নীতির কারণে দেশের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক তোপের মুখে রয়েছেন তিনি। ২৭ অক্টোবরের এই নির্বাচন তাই তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আংশিক ফলাফল ও জরিপের চিত্র ‘দ্য টাইমস অব ইসরায়েল’-এর নির্বাচনি ড্যাশবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল সোয়া ৯টা পর্যন্ত প্রাপ্ত আংশিক ফলাফলে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৯টি আসনে এগিয়ে ছিল। ১২০ আসনের ইসরায়েলি পার্লামেন্টে (নেসেট) সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। ফলে এককভাবে সরকার গঠনের কোনো সুযোগ তার নেই। নির্বাচন-পূর্ববর্তী জরিপগুলোতেও তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি ২৪টি আসন এবং লিকুদ পার্টি ২১টি আসন (আগে ছিল ৩২টি) পেতে পারে বলে আভাস দেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও আইজেনকোটের সমর্থন ছিল ৪৫ শতাংশ, যেখানে নেতানিয়াহুর পক্ষে ছিলেন মাত্র ৩৩ শতাংশ।
যে কারণে কমছে জনসমর্থন নেতানিয়াহু সরকারের গত চার বছরের বিভিন্ন নীতি ইসরায়েলের ভেতরে গভীর বিভাজন তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিচারব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগকে অনেকেই গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন। এছাড়া সেনাবাহিনীতে অতি-রক্ষণশীলদের বাধ্যতামূলক নিয়োগ না দেওয়া এবং ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের মতো কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে।
আরও
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইসরায়েলকে প্রায় একঘরে করে ফেলেছেন নেতানিয়াহু। গাজায় যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনের জেরে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের অনেক দেশই এখন ইসরায়েলের কট্টর সমালোচক। দুর্নীতির দায়ে কারাবাসের শঙ্কা থেকেই তিনি বারবার নির্বাচন পিছিয়েছেন বলেও বিরোধীদের অভিযোগ রয়েছে।
নেতানিয়াহুর টিকে থাকার সমীকরণ এত প্রতিকূলতার পরও বিশ্লেষকেরা নেতানিয়াহুর পতনের বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে নারাজ। হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিডিওন রাহাতের মতে, নেতানিয়াহুর সমর্থনের তিনটি মজবুত ভিত্তি হলো—অতি-রক্ষণশীল ইহুদি গোষ্ঠী, কট্টর ডানপন্থি এবং তার অন্ধ অনুসারীরা। ইসরায়েলের রাজনীতিতে ‘পরিচয়ভিত্তিক’ বা আইডেন্টিটি পলিটিক্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যর্থতার পরও তার সমর্থকেরা ৭ অক্টোবরের হামলার জন্য নেতানিয়াহুর চেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বেশি দায়ী করেন। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও সমমনা ধর্মীয় ও অন্যান্য ডানপন্থি দলগুলোকে নিয়ে জোট গঠনের মাধ্যমে তিনি আবারও ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করবেন।
ভবিষ্যৎ দৃশ্যপট ও শঙ্কা তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উদি সোমার মনে করেন, নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা কমলেও বিরোধী দলগুলো এই জনরোষকে ঠিকমতো কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাথন রাইনহোল্ডের মতে, নেতানিয়াহু পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও ঘনীভূত হবে; হতাশায় অনেকেই দেশ ছাড়ার কথা ভাবছেন।
চূড়ান্ত ফলাফলে কোনো দলই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে বৃহৎ দলগুলোর মধ্যে একটি মধ্যপন্থি জোট গঠিত হতে পারে, নতুবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে আবারও নির্বাচনের পথে হাঁটতে পারে ইসরায়েল। এর আগে ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত চারবার নির্বাচন এবং সাময়িক ক্ষমতা হারানোর পরও ঠিকই ফিরে এসেছিলেন নেতানিয়াহু। রাজনৈতিক চতুরতায় তিনি এবারও কোনো ফাঁকফোকর গলে টিকে যান কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।









