হিন্দু উত্তরাধিকার আইন (দায়ভাগা) অনুযায়ী, ভাইয়ের সম্পত্তিতে কোনো বোন উত্তরাধিকারী বা ‘রিভার্সনার’ হিসেবে স্বত্ব দাবি করতে পারবেন না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। ভাইয়ের সম্পত্তিতে অধিকার দাবি করে করা এক দেওয়ানি রিভিশন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে এই তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে বিচারিক আদালতের দেওয়া রায় ও ডিক্রিও বহাল রাখা হয়েছে।
‘অমর কুমার দাসের উত্তরাধিকারী লিলি রানী দাস এবং অন্যান্য বনাম ড. মনোরঞ্জন মহুরী এবং অন্যান্য’ শীর্ষক মামলার শুনানি শেষে বিচারপতি শেখ আবদুল আউয়াল ও বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন। গত ৯ জুলাই দেওয়া ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গত বুধবার প্রকাশিত হয়েছে। রায়ের মূল অংশটি লিখেছেন বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলাম। আদালতে রিভিশন আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সমীরণ দাস গুপ্ত এবং বিবাদীপক্ষে ছিলেন আইনজীবী তৌফিক আনোয়ার চৌধুরী।
মামলার প্রেক্ষাপট
আদালত ও মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার রামকান্ত বিশ্বাসের এক ছেলে ও তিন মেয়ে ছিল। তিনি ১৯২০ সালে নিজের টাকায় ছেলে সতীশ চন্দ্র বিশ্বাসের নামে পটিয়ায় ১ দশমিক ৩৫ একর জমি কেনেন। তবে বাবার জীবদ্দশাতেই মারা যান ছেলে সতীশ। এরপর ১৯৩৩ সালে রামকান্ত বিশ্বাসও মারা যান। পরবর্তীতে রামকান্ত বিশ্বাসের মেয়ে শৌল বালা দাস ওই জমির মালিকানা উত্তরাধিকার সূত্রে দাবি করেন। অন্যদিকে, সতীশ চন্দ্রের স্ত্রী সাবিত্রী বালা জীবিত থাকাকালে ১৯৯৬ সালে জমিটি ড. মনোরঞ্জন মহুরীর কাছে বিক্রি করে দেন। এই বিক্রয় দলিলটিকে জাল ও প্রতারণামূলক দাবি করে ১৯৯৮ সালে পটিয়ার জজ আদালতে দেওয়ানি মামলা করেন শৌল বালা দাস।
আরও
বিচারিক আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে ২০০০ সালের ২২ জুন শৌল বালার মামলাটি খারিজ করে দেন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতে আপিল করলে ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সেটিও খারিজ হয়। নিম্ন আদালতের এই রায়ে অসন্তুষ্ট হয়ে বাদী ২০০৮ সালে হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন করেন। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ৯ জুলাই সেই রুল খারিজ করে নিম্ন আদালতের রায়ই বহাল রাখলেন উচ্চ আদালত।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট হিন্দু দায়ভাগা আইনের অধীনে বিধবার অধিকার ও উত্তরাধিকারের বিষয়টি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আদালত বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর বিধবা স্ত্রী জীবদ্দশায় স্বামীর সম্পত্তিতে স্বত্ব বা অধিকার লাভ করেন। তবে এই সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে তাঁর ক্ষমতা সীমিত। বিধবা নারী যদি এই সম্পত্তি কারও কাছে হস্তান্তর করেন, তবে তার আইনগত বৈধতা নিয়ে সবাই প্রশ্ন তুলতে পারেন না। কেবল তিনিই আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন, যিনি ওই বিধবার মৃত্যুর পর সম্পত্তির প্রকৃত উত্তরাধিকারী বা ‘রিভার্সনার’ হওয়ার অধিকারী।
আদালত আরও স্পষ্ট করেছেন যে, হিন্দু দায়ভাগা আইনে ভাইয়ের বিধবা স্ত্রীর জীবদ্দশায় ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকারী হওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই। যে ব্যক্তির কোনো সম্পত্তিতে বর্তমানে বা ভবিষ্যতে উত্তরাধিকারী হিসেবে কোনো আইনগত স্বার্থ বা অধিকার নেই, তিনি ওই সম্পত্তি হস্তান্তরকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন না। সম্পত্তি হস্তান্তরটি আইনগত প্রয়োজনে করা হয়নি, কেবল এমন যুক্তি দেখিয়ে সম্পত্তিতে অধিকারহীন কোনো ব্যক্তি আদালতে মামলা করতে পারেন না বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।










