দুধ আর ছানার চিরচেনা রসগোল্লার ধারণা ভেঙে পাঙ্গাস মাছ দিয়ে রসগোল্লা বানিয়ে চমকে দিয়েছেন বগুড়া সদরের নুরানী মোড় এলাকার গৃহবধূ আশা আকতার। মাছ দিয়ে তৈরি হলেও এতে নেই কোনো ধরনের মাছের গন্ধ, বরং স্বাদে এটি নতুন, আলাদা ও চমকপ্রদ। তেমনি লোভনীয়।
পাঙ্গাস মাছের রসগোল্লা তৈরির প্রতিটি ধাপে রয়েছে নিখুঁত যত্ন। মাছ পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে চর্বি আলাদা করা, ছানার সঠিক অনুপাত নির্ধারণ— সব কিছুই তিনি করেন নিজ হাতে। এতে নিশ্চিত হয় গুণগত মান ও স্বাদের ধারাবাহিকতা। এই রসগোল্লা তৈরিতে সময় বেশি লাগলেও, পরিশ্রমও কম নয়। এই ব্যতিক্রমী রসগোল্লা শুধু একটি নতুন খাবারই নয়, বরং এটি একজন নারীর সৃজনশীলতা, সাহস ও উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প।
নারী উদ্যোক্তা আশা আকতার জানান, পরিবারের জন্য নতুন কিছু রান্না করার চেষ্টা থেকেই তার এই ভাবনার জন্ম। বাজারে সহজলভ্য ও তুলনামূলক কম দামের পাঙ্গাস মাছ কীভাবে ভিন্নভাবে ব্যবহার করা যায়— সে চিন্তা থেকেই শুরু হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
আরও
প্রথমে অনেকেই বিশ্বাসই করেনি যে মাছ দিয়ে রসগোল্লা বানানো সম্ভব। আমি নিজেও কয়েকবার ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু বারবার চেষ্টা করে যখন কাঙ্ক্ষিত স্বাদটা পেলাম, তখন বুঝলাম— এটা আলাদা কিছু। এই রসগোল্লা তৈরির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের পরীক্ষা ও অভিজ্ঞতা। কখনো বেশি মাছের গন্ধ, কখনো আবার শক্ত হয়ে যাওয়া— এমন নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। অবশেষে মাছের চর্বি আলাদা করা, সঠিক মাত্রায় ছানা ব্যবহার এবং নিজস্ব মশলার সমন্বয়ে তিনি তৈরি করেন বিশেষ একটি রেসিপি।
আশা আকতার বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মাছের গন্ধ দূর করা। এজন্য মাছ ধোয়া, সিদ্ধ করা আর চর্বি বের করার পদ্ধতিতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। প্রথমে দুধ জাল দিয়ে অল্প পরিমাণ ছানা তৈরি করা হয়। এরপর পাঙ্গাস মাছ ভালোভাবে পরিষ্কার করে সিদ্ধ করা হয়। সিদ্ধ মাছ থেকে চামড়া ছাড়িয়ে কাঁটা আলাদা করা হয়। তারপর পরিষ্কার কাপড়ে মাছ পুঁটলি করে চাপ দিয়ে অতিরিক্ত চর্বি বের করা হয়। এরপর মাছের সঙ্গে ছানা ও নিজস্ব কিছু গোপন মসলা মিশিয়ে ভালোভাবে মেখে খামির তৈরি করা হয়।
এই খামির থেকেই ছোট ছোট গোল বল বানানো হয়। পরে সেগুলো চিনি দিয়ে তৈরি ঘন সিরায় ডুবিয়ে রাখা হয়। দীর্ঘ সময় সিরায় থাকার ফলে বলগুলো নরম, রসালো ও সুস্বাদু হয়ে ওঠে। প্রথমে পরিবারের সদস্যদের দিয়েই এই রসগোল্লা খাওয়ানো হয়। ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর তা আশপাশের প্রতিবেশীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে বিষয়টি এলাকায় আলোচনার জন্ম দেয়।
বর্তমানে তিনি দৈনিক ৪ থেকে ৫ কেজি মিষ্টি তৈরি করতে পারেন। এছাড়াও অর্ডার পেলে সে পরিমাণ মিষ্টি তৈরি করেন। প্রতি কেজি মিষ্টির দাম ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা করিম উদ্দিন বলেন, শুনে অবাক হয়েছিলাম। মাছের রসগোল্লা আবার কী? কিন্তু খাওয়ার পর বুঝলাম, স্বাদে এটা একেবারেই আলাদা। রসগোল্লাটা খেতে খুবই ভালো লেগেছে। স্বাদটা নতুন হলেও বেশ মজার ছিল।
কলেজ শিক্ষার্থী জাহিদ বলেন, আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি এতে মাছের কোনো গন্ধ নেই। নতুন কিছু খাওয়ার অভিজ্ঞতা হলো। স্বাদ আর গন্ধে একেবারেই অন্য রকম। এমন রসগোল্লা আগে কখনো খাইনি।
আশা আকতার বলেন, সংসারের কাজ সামলে এই উদ্যোগ চালিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। তবে পরিবারের সহযোগিতা ও নিজের দৃঢ় মনোবলই এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। আমি চাই, ঘরে বসেই নারীরা যেন কিছু করতে পারে। আমার এই উদ্যোগ যদি অন্যদের অনুপ্রাণিত করে, সেটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। আমার মতো সাধারণ নারীরাও সাহস পাক। সরকার বা সমাজ যদি একটু সহযোগিতা করে, তাহলে আরও বড় পরিসরে কাজ করা সম্ভব। ভবিষ্যতে ছোট পরিসরে হলেও একটি নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে চাই।
তিনি মনে করেন, নারীরা চাইলে ঘরে বসেই আয়মূলক কাজে যুক্ত হতে পারে। বড় পুঁজি না থাকলেও নতুন চিন্তা আর পরিশ্রম থাকলে সাফল্য সম্ভব।
জেলা খাদ্য নিরাপদ কর্তৃপক্ষ বগুড়ার কর্মকর্তা মো. রাসেল বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে পাঙ্গাস মাছ যেহেতু খাবার বিষয় মিষ্টিও তৈরি হয় চিনি ও ছানা দিয়ে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে এবং কোনো কেমিক্যাল ছাড়াই যদি মাছের মিষ্টি তৈরি করা হয় তবে তা নিরাপদ বলে মনে করি। তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে বিস্তারিত জানাতে পারব।
বগুড়া জেলা সিভিল সার্জন খুরশীদ আলম বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। আপনার মাধ্যমে প্রথম শুনলাম। খোঁজখবর নিয়ে বিস্তারিত জানাতে পারব। তবে খাদ্য নিরাপদ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দেখেন। তারপরও কোনো আইনগত সহযোগিতা লাগলে আমরা দিতে পারব।











