সোশ্যাল মিডিয়া হল সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারগুলির মধ্যে একটি যা শুধুমাত্র ব্যবসায়িক ক্ষেত্রকে ত্বরান্বিত করার জন্য নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরে শক্তিশালী যোগাযোগ স্থাপন, তথ্য আদান-প্রদান এবং সচেতনতা সৃষ্টি করার মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের মানসিক স্নায়ুকে প্রভাবিত করছে, কারণ চেতনাবোধ ও সামাজিক জ্ঞান সম্পন্ন মস্তিষ্ক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সময় প্রতিটি কার্যকলাপের সাথে সক্রিয়ভাবে নিযুক্ত থাকে। সামাজিক জ্ঞানের তত্ত্বটি খুবই মনস্তাত্ত্বিকভাবে কাজ করে থাকে যার মাধ্যমে মানুষ তাদের নিজস্ব এবং অন্যদের সামাজিক আচরণকে উপলব্ধি করে, চিন্তা করে, ব্যাখ্যা করে এবং বিচার করে থাকে।
যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম প্রত্যেক ব্যক্তিকে স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে স্বতন্ত্র মতামত প্রধানের একটি উন্মুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে, তাই বিকল্প মিডিয়া হিসাবে এর বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে ২০২৪ এর জুলাই-আগস্ট -এ বাংলাদেশ একটি ঐতিহাসিক বিপ্লব সংগঠিত হয়েছে যেটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ছাত্র আন্দোলন। এ আন্দোলন পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার বিপ্লব ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এই আন্দোলনটি দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে এবং বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তিশালী প্রভাবকে আমাদের সামনে উন্মোচন করেছে। উদাহরণস্বরুপ – বিরোধী দলের সাথে জড়িত থাকা এবং হাসিনা সরকারের নীতির সমালোচনা করার কারণে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কুমিল্লার স্থানীয় নেতা জনাব গোলাম কিবরিয়া অপুকে ৪ ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে কুমিল্লায় তার বাসভবন থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়েছিলো তৎকালীন প্রশাসনের সহায়তায় ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে। তিনি কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত ছাত্র বিক্ষোভের সময় সক্রিয়ভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে বাংলাদেশ পুলিশ তাকে গুলি করে আহত করে, কিন্তু তিনি গণতন্ত্র রক্ষায় আত্মসমর্পণ করেননি। বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়া সেলিব্রেটি ব্যক্তিরা তাদের জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে এ আন্দোলনে সকল শ্রেণিপেশার মানুষকে ব্যাপকভাবে রাজপথে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।
আন্দোলন চলাকালে তাদের কন্টেন্টের মাধ্যমে যেসব বার্তা তারা প্রচার করেছিলেন তা তাদের অনুসারীদের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং যেকোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষকে ফ্যাসিস্ট এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে সরাসরি প্রভাবিত করেছে। সুতরাং, বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থা পতন ঘটানোর সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার ছিল ঐক্যবদ্ধতা। সোশ্যাল মিডিয়া সেলিব্রিটিরা তাদের ফ্যান-ফলোয়ারদেরকে আন্দোলনে যোগ দিতে এবং ফ্যাসিস্ট শাসন এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে উৎসাহ – অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল । সেলিব্রিটি এবং বিরোধী দলগুলি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ বিরোধী জনমত গঠন এবং প্রথাগত মিডিয়াকে পাশকাটিয়ে বিরাট সংখ্যক ফ্যান ফলোয়ারদের সাথে নিয়ে আপামর জনতাকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিল।
গবেষক মোঃ এমরান হোসেন, মোঃ মাহাদী হাসান এবং ডঃ নীল ওয়াসন্থা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষমতা: ২০২৪ সালে বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তনের উপর একটি কেস স্টাডি পরিচালনা করছিলেন। এই রিসার্চটি ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ সোসিওলজি এন্ড ল, ইন্দোনেশিয়া নামক একটি স্বনামধন্য জার্নাল এ প্রকাশিত হয়েছিল। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এবং রাজনৈতিক পট পরিবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্যে সম্পর্ক, সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার এবং বাংলাদেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে এর ভূমিকা সম্পর্কে অনুসন্ধান করা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক প্রচারণা-জনসংযোগ এবং রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের মধ্যেও একটা সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়। তবে, নির্ভরযোগ্যতা এবং বৈধতার বিশ্লেষণের ফলাফল ইতিবাচকভাবে নির্দেশিত হয়েছে। সমস্ত ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভেরিয়েবলের ফলাফলগুলি ডিপেন্ডেন্ট ভেরিয়েবল দিয়ে পরীক্ষা করার পর গবেষণার ইতিবাচক ফলাফল দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করেছে। ফলে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনে সোশ্যাল মিডিয়া ও ছাত্রদের যুগপৎ ভূমিকা সুনির্দিষ্টভাবে উঠে এসেছে। পাশাপাশি মাঠের রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পরা রাজনৈতিক দলগুলো ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনের একটি বৃহৎ প্লাটফর্ম হিসাবে সোশ্যাল মিডিয়াকে বেছে নেয়।
ছাত্র নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন বাংলাদেশের ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করে। স্বৈরাচার শেখ হাসিনা তার ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। কিন্তু তিনি ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট জুড়ে আন্দোলনকারীদের উপর ক্রমাগত দমন-পীড়ন চালিয়েছিলেন এবং তার নিজে দেশের নাগরিকদেরকে নির্বিচারে হত্যা করেছিলেন। বাংলাদেশের জনগণ গণতন্ত্রে ফিরে আসে এবং ৮ই আগস্ট ২০২৪ -এ একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে। এ আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হয়েছে “ছাত্রদের জুলাই বিপ্লব” হিসাবে। গবেষণা অনুসারে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি ফ্যাসিস্ট সরকারকে উৎখাত করতে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছিল।
স্বৈরাচারী সরকারের অধীনে গত ১৬ বছরে জনগণ অবর্ণনীয় নির্যাতন ও অবিচারের শিকার হয়েছে। মূলত সরকার বিরোধী আন্দোলনের সময় সোশ্যাল মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যেমন- লক্ষ লক্ষ মানুষকে সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার করে রাজপথে জড়ো করা এবং দলমত নির্বিশেষে সকল শ্রেণিপেশার মানুষকে এক ছাতার নিচে আনার মত দুঃসাধ্য সাধন করা। মূলধারার বহু গণমাধ্যম যখন ফ্যাসিস্টের পদলেহন করে রাষ্ট্রীয় অত্যাচারকে বৈধতা দিতে উঠে পরে লেগেছিল ঠিক তখনই অত্যাচারিত ও নিপীড়িত জনতার আস্থার জায়গা হয়ে উঠে সোশাল মিডিয়া প্লাটফর্মগুলো। ফলশ্রুতিতে প্রচলিত বহু মিডিয়ার অপপ্রচারকে পাশ কাটিয়ে একটি গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত করা সম্ভব হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, গবেষণাটিতে বিপ্লবকালীন সময়ে সেলিব্রিটিদের ভূমিকা বিশেষভাবে দৃষ্টি কেড়েছে। তারা আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের সাথে একাত্মতা পোষণ করে আন্দোলনকে আরও উজ্জীবিত ও বেগবান করেছিলেন। অবশেষে ছাত্র নেতৃত্বাধীন বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন বাংলাদেশের স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা তার ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয় এবং দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়।
প্রবাস টাইমে লিখুন আপনিও। প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটির নানা আয়োজন, ঘটনা-দুর্ঘটনা, প্রবাসীদের সুযোগ-সুবিধা, সমস্যা-সম্ভাবনা, সাফল্য, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের খবর, ছবি ও ভিডিও আমাদের পাঠাতে পারেন news@probashtime.com মেইলে।

Discussion about this post