দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে বাংলাদেশকে নিজেদের অন্যতম সেরা যুদ্ধবিমান ‘জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক ৩’-এর একটি পূর্ণাঙ্গ সিমুলেটর হস্তান্তর করেছে পাকিস্তান। সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এটি নিছক কোনো উপহার বা বিচ্ছিন্ন অনুদান নয়; বরং দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধবিমান ক্রয়ের চূড়ান্ত চুক্তির আগের একটি বড় প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ। ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়ার এক প্রতিবেদনে এই সামরিক ও কৌশলগত তৎপরতার বিষয়টি উঠে এসেছে।
চলতি বছরের মে মাসে ঢাকায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর মধ্যে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক ‘এয়ার স্টাফ টকস’ অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকেই পাকিস্তানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অংশ নেয় এবং সিমুলেটর হস্তান্তরের বিষয়টি সামনে আসে। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অপারেশনাল ডেপুটি চিফ অব এয়ার স্টাফ, ‘কমান্ডার স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড’ ও ডিরেক্টর জেনারেল পাবলিক রিলেশনস এয়ার ভাইস মার্শাল আওরঙ্গজেব আহমেদ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন এয়ার কমোডর শাহ খালিদ, এয়ার কমোডর আবদুল গফুর বাজদুর, গ্রুপ ক্যাপ্টেন মাহমুদ আলী খান এবং উইং কমান্ডার হাসান তারিক আজিজ। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিনিধিদলের এমন ওজনদার কাঠামোই প্রমাণ করে যে সফরটি কেবল কোনো সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না, এর পেছনে সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত উদ্দেশ্য নিহিত ছিল।
বৈঠকে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা জেএফ-১৭ ব্লক ৩ যুদ্ধবিমানের বহুমুখী রণকৌশল ও সক্ষমতার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেন। জানা গেছে, গত বছর (২০২৫ সালের মে মাসে) ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তৈরি হওয়া যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রাফাল বিমানের তুলনায় জেএফ-১৭-এর কার্যকারিতা কেমন ছিল, তার একটি তুলনামূলক চিত্রও বাংলাদেশের সামনে উপস্থাপন করা হয়। সামরিক সমীকরণে এ ধরনের প্রচারণার ব্যাপক ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান যেমন নিজেদের বাণিজ্যিক লক্ষ্য পূরণের পথে এগোচ্ছে, তেমনি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছেও একটি কড়া কৌশলগত বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।
আরও
পাকিস্তান যে সিমুলেটরটি বাংলাদেশে পাঠিয়েছে, সেটি প্রাথমিক স্তরের কোনো প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা নয়; বরং এটি সম্পূর্ণ যুদ্ধকালীন মান বজায় রেখে তৈরি করা জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক ৩-এর একটি পূর্ণাঙ্গ সিমুলেটর। এই আধুনিক সিস্টেমের সাহায্যে বৈমানিকেরা আসল যুদ্ধবিমানে ওঠার আগেই যেকোনো অভিযান বা মিশনের বাস্তবসম্মত মহড়া দিতে পারবেন। নতুন যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সময় লাগে পাইলটদের ওই বিমানের জন্য দক্ষ করে তুলতে। সিমুলেটরটি আগেভাগে হাতে পাওয়ায় পাইলটদের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানরাও এর অভ্যন্তরীণ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
আধুনিক সামরিক বাহিনীতে যুদ্ধবিমান যুক্ত করার ক্ষেত্রে লজিস্টিকস, রক্ষণাবেক্ষণ নীতি ও মানবসম্পদ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এ ধরনের সিমুলেটর হস্তান্তরকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। আগাম এই প্রস্তুতির কারণে ভবিষ্যতে মূল ফাইটার জেটগুলো যখন বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রনে যুক্ত হবে, তখন আর পাইলটদের নতুন করে তৈরি করার জন্য বাড়তি সময় বা জটিলতা পোহাতে হবে না। সার্বিক দিক বিবেচনা করে বিশ্লেষকেরা বলছেন, সিমুলেটর হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্ভাব্য বহুমুখী যুদ্ধবিমান ক্রয় চুক্তির অত্যন্ত কার্যকর ও প্রাথমিক একটি ধাপ।









