হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা এখন চরম সংঘাতে রূপ নিয়েছে। ওমান উপসাগরের জলসীমায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানের ছোড়া ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে এক ভারতীয় নাবিক নিহত ও আরও আটজন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করে বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও একযোগে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তেহরান। সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্টের এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
আজ মঙ্গলবার সকালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ওমানি জলসীমায় হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ লেনে তাদের ‘মম্বাসা’ ও ‘আল বাহিয়া’ নামের দুটি জাতীয় ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে ইরান এই হামলা চালিয়েছে। এতে মম্বাসা ট্যাংকারে থাকা এক ভারতীয় কর্মী প্রাণ হারান। আহত আটজনের মধ্যে ছয়জন ভারতীয় ও দুজন ইউক্রেনের নাগরিক, যাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আন্তর্জাতিক আইনের এই গুরুতর লঙ্ঘনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আমিরাত হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।
অন্যদিকে, এই হামলার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। তাদের দাবি, ওই ট্যাংকার দুটি সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে এবং নেভিগেশন সিস্টেম বন্ধ রেখে মাইন বিছানো বেআইনি পথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, আগ্রাসী যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনায় এই অবৈধ রুট ব্যবহার ও তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করলে এর পরিণাম হবে ভয়াবহ। এর ফলে প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার কাজে বিলম্ব হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে চরম জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে।
আরও
এই সংঘাত শুধু ওমান সাগর এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য আরব রাষ্ট্রেও। মঙ্গলবার সকালে বাহরাইনে বিমান হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। বাহরাইনের রাজপরিবারের মিডিয়া উপদেষ্টা জানিয়েছেন, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সফলভাবে ইরানি হামলা প্রতিহত করেছে। তবে আইআরজিসির দাবি, তাদের নিখুঁত হামলায় মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের এয়ার কন্ট্রোল ও প্যাট্রিয়ট রাডার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। পাশাপাশি কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির যোগাযোগব্যবস্থা ও গোলাবারুদের ডিপোতেও ইরানি ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে তেহরানের সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছে। যদিও মার্কিন সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স ইরানের এই ক্ষয়ক্ষতির দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
এর বাইরে জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথাও নিশ্চিত করেছে আইআরজিসি। ফরাসি একটি সংবাদ সংস্থায় প্রকাশিত বিবৃতিতে তারা জর্ডানের জনগণকে তাদের দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। আইআরজিসি স্পষ্ট করেছে যে জর্ডানের জনগণের সঙ্গে ইরানের কোনো শত্রুতা নেই, বরং ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা বর্বরোচিত নিধনের অংশীদার হওয়ার হাত থেকে তাদের দেশটিকে রক্ষা করতেই এই আহ্বান জানানো হয়েছে। এদিকে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, ওমানের কালহাতের উত্তর-পূর্বে অপর একটি ট্যাংকারে অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলেও সেখানে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
এই সংঘাতের পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক ঘোষণাও বড় ভূমিকা রাখছে। সোমবারই তিনি ঘোষণা দেন যে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং নিরাপত্তার মাশুল হিসেবে সেখান দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো থেকে ২০ শতাংশ টোল আদায় করবে। ট্রাম্পের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ড হুংকার দিয়ে বলেছে, এই প্রণালির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকাই নেই এবং এ অঞ্চলে তাদের কোনোভাবেই নাক গলাতে দেওয়া হবে না।









