টানা দেড় বছর ধরে ছেলের মৃত্যু নিশ্চিত ধরে নিয়ে চরম শোকে দিন কাটিয়েছে পরিবার। নিখোঁজ ছেলের খোঁজে বিভিন্ন হাসপাতালের মর্গ তন্নতন্ন করে খোঁজার পর বাধ্য হয়ে সংগ্রহ করা হয়েছিল মৃত্যু সনদও। কিন্তু দীর্ঘ এই বিষাদের অবসান ঘটিয়ে জানা গেল, ২৫ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি যুবক ঈদ নাঈল আবু শার মারা যাননি; তিনি এত দিন ইসরায়েলের ওফার কারাগারে জীবিত অবস্থায় বন্দী ছিলেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৪ মে এক আইনজীবীর ফোনকলের মাধ্যমে এই অভাবনীয় সংবাদ নিশ্চিত হওয়ার পর গাজার ওই শোকাহত পরিবারটিতে মুহূর্তেই আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর কাজের সন্ধানে গাজার কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নেটজারিম করিডরের কাছে গিয়ে নিখোঁজ হন ঈদ। ওই এলাকাটি ফিলিস্তিনিদের কাছে ‘অ্যাক্সিস অব ডেথ’ বা ‘মৃত্যুর কেন্দ্র’ নামে পরিচিত, যেখানে এর আগেও বহু ফিলিস্তিনি নিহত বা গুম হয়েছেন। ঈদের বাবা নাঈল আবু শার জানান, ছেলেকে খুঁজতে তিনি প্রতিদিন আল-আকসা, আল-আওদা ও নুসেইরাত হাসপাতালসহ বিভিন্ন মর্গের দরজায় ধরনা দিয়েছেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের সহায়তা চেয়েও কোনো সন্ধান মেলেনি। কোনো সংস্থার কাছেই ঈদের আটক থাকার কোনো নথি না থাকায় একসময় বাধ্য হয়ে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে তাঁর মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করে শোক পালনের জন্য তাঁবুও খাঁটিয়েছিল পরিবারটি।
সবাই ঈদকে মৃত ধরে নিলেও তাঁর মা মাহা আবু শার কখনো আশা ছাড়েননি। তিনি জানান, সবাই তাঁকে গায়েবানা জানাজা পড়তে বললেও তাঁর মন বলত ছেলে বেঁচে আছে। তাঁর সেই অটুট বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত সত্য প্রমাণিত হয়। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া এক সাবেক বন্দী জানান, তিনি কারাগারে ঈদ নামের একজনকে দেখেছেন। পরে গত ৪ মে এক আইনজীবী আনুষ্ঠানিকভাবে ঈদের বন্দী থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করলে ওই পরিবার ও প্রতিবেশীদের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করে আনন্দ উদ্যাপন করা হয়। তবে ছেলের সন্ধান পেলেও মা মাহার শঙ্কা কাটেনি। তিনি বলেন, ছেলে বেঁচে আছে জেনে খুশি হলেও কারাগারের অমানবিক পরিবেশে সে কী সহ্য করছে—তা ভেবে তাঁর ভয় হচ্ছে। ছেলেকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরতে পারলেই সত্যিকারের শান্তি পাবেন বলে জানান এই মা।
আরও
ঈদ নাঈল আবু শারের এই ঘটনা গাজার হাজারো পরিবারের নিদারুণ অনিশ্চয়তার একটি প্রতীকী চিত্র মাত্র। ফিলিস্তিনি সেন্টার ফর দ্য মিসিং অ্যান্ড ফোর্সিবলি ডিসঅ্যাপিয়ার্ডের পরিচালক নাদা নাবিলের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে গাজায় ৭ থেকে ৮ হাজার ফিলিস্তিনি নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত দেড় হাজার জন ইসরায়েলের বিভিন্ন কারাগারে গোপন অবস্থায় বন্দী থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নাবিলের অভিযোগ, আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তথ্য গোপন রাখা ইসরায়েলের একটি পরিকল্পিত কৌশল, যা স্বজনহারা পরিবারগুলোর মানসিক যন্ত্রণা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। প্রিয়জন ধ্বংসস্তূপের নিচে, গণকবরে নাকি কারাগারে আছেন—তা জানতে না পারার এই ভয়াবহ অনিশ্চয়তাকে মনোবিজ্ঞানীরা ‘সাসপেন্ডেড গ্রিফ’ বা ‘স্থগিত শোক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।










