যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সর্বাত্মক যুদ্ধ এবং লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ইরানের অর্থনীতিতে এক গভীর ও নজিরবিহীন সংকট দেখা দিয়েছে। এই বহুমুখী সংকটের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে দেশটির সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জনজীবনে। অর্থনৈতিক অচলাবস্থার কারণে এরই মধ্যে চাকরি হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ। খাদ্য ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ থেকে শুরু করে গাড়ি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য—প্রায় সবকিছুর দামই গত সপ্তাহের তুলনায় চলতি সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।
এই চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পেছনে মূলত অভ্যন্তরীণ দুর্বল ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর ধারাবাহিক হামলা, কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধকে দায়ী করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি রাজধানী তেহরানসহ দেশজুড়ে সরকারের আরোপিত প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট টানা ৬৪ দিনে গড়ানোয় ৯ কোটিরও বেশি মানুষের এই দেশের অর্থনীতি আক্ষরিক অর্থেই পঙ্গু হয়ে পড়েছে। এর ফলে খোলা বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানের জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের রেকর্ড পরিমাণ দরপতন ঘটেছে এবং তা ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে প্রতি ডলারে ১৮ লাখ ৪০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। বাজারে এমন চরম অস্থিরতার কারণে সার্বিক মুদ্রা লেনদেনও উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
সার্বিক এই পরিস্থিতির কারণে অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজারেও চরম বিশৃঙ্খলা ও চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় বিক্রেতা ও ক্রেতারা কেউই নিশ্চিত নন পরিস্থিতি ভবিষ্যতে কতটা খারাপ হতে পারে বা বাজারে নতুন পণ্য আদৌ আসবে কি না। এই সুযোগে কিছু অসাধু বিক্রেতা অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন, যা গত এক দশকের উচ্চ মূল্যস্ফীতির অভিজ্ঞতার মধ্যেও বিরল। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্সের ২৫৬ জিবি সংস্করণের দাম ১ হাজার ২০০ ডলার হলেও, তেহরানের কিছু দোকানে তা প্রায় ৫০০ কোটি রিয়াল (২ হাজার ৭৫০ ডলার) দামে বিক্রি করা হচ্ছে। একইভাবে, ইরানে উৎপাদিত ফরাসি গাড়ি পিউজো ২০৬-এর দাম পৌঁছেছে প্রায় ৩০০ কোটি রিয়ালে (১৬ হাজার ৫০০ ডলার)। আমদানিকৃত গাড়িগুলো পার্শ্ববর্তী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের তুলনায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
আরও
বাজারে যখন এমন আগুন পরিস্থিতি, তখন ইরানে একজন শ্রমিকের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১৭ কোটি রিয়ালেরও কম (প্রায় ৯২ ডলার)। যদিও গত ২১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া নতুন পারস্য বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী সরকার এই মজুরি প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়িয়েছে এবং জনপ্রতি মাসে প্রায় ১০ ডলার সমমূল্যের খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ভর্তুকি দিচ্ছে, তবে তা বর্তমান মূল্যস্ফীতির তুলনায় একেবারেই নগণ্য। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন শুক্রবার এক প্রতিবেদনে গাড়ির বাজারে ‘প্রতিদিনই’ দাম বাড়ার জন্য মূল্যস্ফীতি-সংক্রান্ত ‘মনস্তাত্ত্বিক’ কারণ এবং মুনাফালোভী বিক্রেতাদের ‘ভুয়া মূল্য নির্ধারণ’কে দায়ী করেছে। তেহরানের এক হতাশ বাসিন্দা জানান, আয় ও ব্যয়ের বিশাল ব্যবধানে তাঁদের দৈনন্দিন হিসাব মেলাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে; বাধ্য হয়ে জমানো টাকায় এখনই প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে রাখছেন, কারণ ভবিষ্যতে হয়তো আর সেটুকু সামর্থ্যও অবশিষ্ট থাকবে না।










