আন্তর্জাতিক ভ্রমণে ইমিগ্রেশন পার হওয়া মানেই পাসপোর্ট ও ভিসা হাতে নিয়ে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষার এক ক্লান্তিকর দৃশ্য। তবে বিশ্বজুড়ে ভ্রমণপিপাসুদের এই চেনা অভিজ্ঞতায় এবার এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের প্রচলিত নথিপত্র প্রদর্শনের বদলে এখন থেকে বায়োমেট্রিক বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ওপরই সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সীমান্ত নিরাপত্তায় আধুনিকায়ন ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করার এই উদ্যোগের ফলে দেশটিতে ভ্রমণকারী যাত্রীরা এখন কোনো ধরনের পাসপোর্ট বের করার ঝামেলা ছাড়াই মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ইমিগ্রেশন পার হতে পারবেন। মার্কিন শুল্ক ও সীমান্ত সুরক্ষা কর্তৃপক্ষের (সিবিপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ‘গ্লোবাল এন্ট্রি’ সুবিধাভোগীরা পুরোপুরি পাসপোর্টবিহীন ইমিগ্রেশনের সুবিধা পাবেন। ইতিমধ্যেই দেশটির ২৩৮টি বিমানবন্দরে এই অত্যাধুনিক বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি চালু করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৩টি বিমানবন্দরে উন্নত যাত্রী প্রক্রিয়াকরণ এবং ৭টি বিমানবন্দরে দ্রুত সীমান্ত পারাপারের বিশেষ ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।
নতুন এই নিয়মে মার্কিন নাগরিক এবং বিদেশি যাত্রীদের জন্য অবশ্য ভিন্ন ভিন্ন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। গত ২৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া নতুন ফেডারেল আইন অনুযায়ী, দেশটিতে প্রবেশ ও প্রস্থানের ক্ষেত্রে বিদেশিদের জন্য বায়োমেট্রিক পদ্ধতি সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পূর্বে ১৭ বছরের নিচে এবং ৭৯ বছরের বেশি বয়সীদের এই প্রক্রিয়ার আওতামুক্ত রাখা হলেও, বর্তমান নিয়মে সেই বয়সভিত্তিক ছাড় সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। ফলে আকাশ, স্থল বা সমুদ্রপথে যাতায়াতকারী যেকোনো বিদেশি নাগরিককেই এখন মুখমণ্ডলের স্ক্যান বা আঙুলের ছাপ দিতে হবে। তবে মার্কিন নাগরিকরা চাইলে বায়োমেট্রিক পদ্ধতির পরিবর্তে আগের মতোই ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার মাধ্যমে সনাতন পদ্ধতিতে নিজেদের পরিচয় যাচাই করার সুযোগ পাবেন। এই স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় যাত্রীর তোলা ছবি তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত ভিসা বা পাসপোর্টের ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।
সীমান্ত নিরাপত্তায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এই ব্যবহার ইতিমধ্যেই ব্যাপক সফলতা দেখাতে শুরু করেছে। কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, মুখমণ্ডল শনাক্তকরণের এই প্রযুক্তির নির্ভুলতার হার ৯৮ শতাংশেরও বেশি। ২০১৭ সালের জুন মাস থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮৪ কোটি ৮০ লাখ যাত্রী এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছেন। এই শক্তিশালী ব্যবস্থার মাধ্যমেই ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে অবস্থান করা ৫ লাখ ২৯ হাজারের বেশি বিদেশিকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সব বন্দর ও সীমান্ত পারাপারে এই ব্যবস্থা পুরোপুরি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে মার্কিন সরকার। শুধু ইমিগ্রেশনই নয়, আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে এমন এক অত্যাধুনিক লাগেজ পরীক্ষা ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে উড়োজাহাজ আকাশে থাকা অবস্থাতেই কর্মকর্তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাগেজ তল্লাশি করতে পারবেন। সব মিলিয়ে অদূর ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের যাতায়াত ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় ও প্রযুক্তিনির্ভর হতে যাচ্ছে।










