বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ সুরক্ষায় নতুন একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব। বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশ সৌদির নেতৃত্বাধীন এই জোটে রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, যৌথ সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ নামের এই জোট গঠন করা হয়েছে।
জোটভুক্ত দেশগুলো জানিয়েছে, ভারত মহাসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই কৌশলগত সমুদ্রপথে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি পরিবহন নিরাপদ রাখাই হবে তাদের প্রধান লক্ষ্য। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্বের তেল ও গ্যাস রপ্তানির একটি বড় অংশ আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হলেও সেখানে অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় বাব আল-মান্দেব-লোহিত সাগর-এডেন উপসাগর রুটও ব্যাপকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সৌদি আরব জানিয়েছে, জোট গঠনের বৈঠকে আমন্ত্রিত ৫১ দেশের মধ্যে ৪৩টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিল। যদিও ইইউর ইতিমধ্যে লোহিত সাগরে ‘অ্যাসপিডিস’ নামে একটি নৌ নিরাপত্তা মিশন রয়েছে, নতুন এই জোটের কার্যক্রম তার চেয়ে কীভাবে আলাদা হবে, তা এখনো স্পষ্ট করা হয়নি। সৌদি আরব ছাড়া জোটের অন্য সদস্য দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও কোমোরোস। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান এখনো এই জোটে যোগ দেয়নি, যদিও চলমান সংকটে তাদের নিরাপত্তা স্বার্থও অনেকটাই একই ধরনের।
আরও
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় জাতীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর অন্য দেশগুলোর জন্যও এই জোটে যোগদানের সুযোগ উন্মুক্ত থাকবে। জোটে কোন দেশ কতটি যুদ্ধজাহাজ বা বিমান দেবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি। তবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ পরিকল্পনা, সমন্বিত মহড়া এবং সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানানো হয়েছে। সৌদি আরব জোর দিয়ে বলেছে, এই জোটের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে গঠন করা হয়নি। জোটটির সদর দপ্তর সৌদি আরবেই হবে, তবে এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি।
গত সপ্তাহে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করে, যার ফলে লোহিত সাগরমুখী তেল পরিবহন ব্যাহত হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়লেও সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলের তেল শোধনাগার থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পরিবহন অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে সেই তেল রপ্তানির জন্য বাব আল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রম করতে হয়। ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও ইয়েমেনের মাঝখানে অবস্থিত মাত্র ২৯ কিলোমিটার প্রশস্ত এই সংকীর্ণ জলপথের ইয়েমেন অংশ হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঝুঁকি রয়ে গেছে। বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ এবং প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় যেকোনো ধরনের বিঘ্ন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।









