ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শ্রমবাজারের বিশাল ঘাটতি পূরণে জোটের বাইরের দেশগুলো থেকে চাকরিপ্রার্থীদের নিয়োগে তৈরি করা হচ্ছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ট্যালেন্ট পুল।
২০ মার্চ ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বিদেশি চাকরিপ্রার্থীদের জোটভুক্ত দেশগুলোতে নিয়োগ দিতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) ট্যালেন্ট পুল নামের এই প্ল্যাটফর্ম তৈরির অনুমোদন দিয়েছে। এর মাধ্যমে জোটভুক্ত দেশগুলোর যেসব খাত কর্মী শূন্যতায় ভুগছে, সেসব খাতে বিদেশি কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সহজ করবে।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অনলাইনে নিয়োগ পদ্ধতির এই প্ল্যাটফর্মের প্রতি পার্লামেন্টের সমর্থনকে স্বাগত জানিয়েছেন পার্লামেন্ট সদস্য এবং র্যাপোর্টার আবির আল-সাহলানি (রিনিউ, সুইডেন)। তিনি বলেছেন, ‘‘আমাদের অর্থনীতিতে শ্রম ঘাটতির কারণে ইইউ তার প্রতিযোগীদের থেকে পিছিয়ে পড়ছে। এই ঘাটতি মোকাবিলা এবং প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে শ্রম অভিবাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ পন্থা।
আল-সাহলানি বলেন, ইইউ ট্যালেন্ট পুল নিরাপদ এবং আইনি পথের মাধ্যমে নিয়োগকর্তাদের চাহিদা অনুযায়ী সম্ভাব্য কর্মীদের ইউরোপে আসার সুযোগ করে দেবে। তিনি বলেন, ‘‘এই ট্যালেন্ট পুল প্ল্যাটফর্মটি হবে ব্যবহারকারীবান্ধব। এর মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের আবেদন যাচাই-বাছাই এবং কর্মী শোষণের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’’
খসড়া নিয়মগুলোর পক্ষে ৪৬টি ভোট পড়েছে। বিপক্ষে পড়েছে ২৫টি ভোট। আর ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন দুজন। এপ্রিলে পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের সময় এই প্রতিবেদনটিকে আবারও অনুমোদন দেওয়া হবে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে। এরপর সদস্য রাষ্ট্রগুলো বিলের চূড়ান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করবে।
• ইইউ ট্যালেন্টপুল কী?
ইইউ ট্যালেন্ট পুল হবে প্রথম অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ইইউয়ের বাইরের দেশের চাকরিপ্রার্থীরা তাদের প্রোফাইল খুলবে এবং নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে সব ধরনের তথ্য সাজিয়ে রাখবে। আর ইউরোপীয় নিয়োগকর্তারা সেই প্রোফাইল যাচাই করে শূন্যপদে নিয়োগ দেবে।
ইউরোপীয় কমিশন ২০২২ সালের এপ্রিলে একটি ট্যালেন্ট পুল পাইলট উদ্যোগ চালু করে। বিশেষত ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের ইইউ শ্রমবাজারের চাকরির সুযোগ করে দেওয়াই ছিল এর লক্ষ্য। ২০২৩ সালের নভেম্বরে কমিশন তৃতীয় দেশে বসবাসরত তৃতীয় দেশের নাগরিকদের জন্য একটি ইইউ ট্যালেন্ট পুল তৈরির প্রস্তাব দেয়।
• কীভাবে কাজ করবে এবং কারা সুযোগ পাবেন?
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাধারণ নীতিমালা মেনে ন্যায্য নিয়োগ প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে ইইউ ট্যালেন্ট পুল তৈরি করা হবে। ফলে, প্ল্যাটফর্মটি সব দক্ষতা এবং যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
প্ল্যাটফর্মটিতে নিয়োগকর্তা এবং চাকরিপ্রার্থীরা যাতে একে অপরের চাহিদা অনুযায়ী যুক্ত হতে পারেন, সেজন্য প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপনের সুযোগ থাকবে।
• নিয়োগকারীর প্রোফাইলে যেসব তথ্য থাকবে
• নিয়োগকারীর নাম বা প্রতিষ্ঠানের নাম
• কোম্পানির নিবন্ধন নম্বর
• কোম্পানির কার্যক্রমের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ
• কাজের বিবরণ
• কাজের স্থান
• কর্মঘণ্টা
• পারিশ্রমিক
• বেতনভিত্তিক ছুটি
• চাকরিপ্রার্থীদের প্রোফাইলে যেসব তথ্য থাকবে
• পছন্দের ইইউ দেশ
• কবে থেকে কাজে যোগদানে প্রস্তুত
• দক্ষতা এবং কাজের অভিজ্ঞতা
• অ্যাকাউন্ট করতে কি টাকা লাগবে?
কমিশন জানিয়েছে, এই প্ল্যাটফর্মটিতে কোনো রকম বৈষম্যমূলক আচরণ থাকবে না এবং চাকরিপ্রার্থীরা বিনা খরচে এটি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
তবে একটি ইইউ দেশ কত সংখ্যক বিদেশি কর্মী নিয়োগ দেবেন, সেটা ওই দেশটির নিজেদের সিদ্ধান্ত৷ সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী নিয়োগে ব্যবস্থা নেবে।
• সব ইইউ দেশ কি এটি ব্যবহার করবে?
এটিও ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের সিদ্ধান্ত। প্রতিটি দেশের সরকার নিজেদের মতো করে এই সিদ্ধান্ত নেবে। তৃতীয় দেশ থেকে কর্মী নিয়োগের সংখ্যাটিও সদস্য রাষ্ট্রগুলো ঠিক করবে।
• নিয়োগকারী এবং শ্রম অধিকার সংস্থার প্রতিক্রিয়া
অভিবাসন এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিক্রিয়াও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে৷ শ্রম অভিবাসনও আলাদা কিছু নয়। কিছু বিরোধী পক্ষ এর বিরোধিতায় বলছে, অন্যান্য দেশ থেকে সম্ভাব্য কর্মী নিয়োগের আগে সরকারের উচিত স্থানীয়দের নিয়োগে মনোনিবেশ করা।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ইউরোপিয়ান ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন (ইটিইউসি) এক চিঠিতে ওই সময় প্রস্তাবিত ইইউ ট্যালেন্ট পুল প্রত্যাখ্যান করেছে। বিপরীতে ইটিইউসি বলেছে, অভিবাসীদের কর্মপরিবেশের মান স্থানীয় কর্মীদের মতোই থাকবে, তার নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং এবং ইইউ ট্যালেন্ট পুল নিয়োগ নীতি বিদ্যমান জাতীয় নিয়োগ ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
তবে, অনেক সংস্থা শ্রম ঘাটতি মোকাবিলা এবং দক্ষ কর্মীদের ইইউর প্রতি আকৃষ্ট করতে ইইউ ট্যালেন্ট পুলের প্রতি তাদের সমর্থন জানিয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং ক্যাফে অ্যাসোসিয়েশন (এইচওটিআরইসি) এর মতো নিয়োগকর্তাদের সংগঠনগুলো ট্যালেন্ট পুল প্রতিষ্ঠা এবং ঘাটতিতে থাকা পেশার তালিকা নির্ধারণে সমিতির সঙ্গে আলোচনাও করতে রাজি।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) ইইউ ট্যালেন্ট পুল চালুর সুপারিশ করেছে এবং ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে ন্যাশনাল ভিসা/আবাসিক অনুমতির আবেদনের জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করার পরামর্শ দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক নিয়োগ এবং দক্ষতার ঘাটতি পূরণের মাধ্যমে অভিবাসনের আইনি পথ সহজ করার এই প্রস্তাবকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতাসহ অন্যান্য নীতিমালা মেনে চলার উপরও গুরুত্বারোপ করেছে জাতিসংঘের এই সংস্থাটি। ইনফোমাইগ্রেন্টস।
প্রবাস টাইমে লিখুন আপনিও। প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটির নানা আয়োজন, ঘটনা-দুর্ঘটনা, প্রবাসীদের সুযোগ-সুবিধা, সমস্যা-সম্ভাবনা, সাফল্য, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের খবর, ছবি ও ভিডিও আমাদের পাঠাতে পারেন news@probashtime.com মেইলে।

Discussion about this post