প্রিয়জনের মৃত্যু শোকের পাহাড় সমান। কিন্তু সেই মৃতদেহ যদি হয় প্রবাসে বা নিজ শহর থেকে দূরে, তবে তাকে শেষ ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়াটা হয়ে দাঁড়ায় বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষ করে বিমানে মরদেহ পরিবহন কোনো সাধারণ প্রক্রিয়া নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক আইন, স্বাস্থ্যবিধি এবং এয়ারলাইন্সের কঠোর নীতিমালা। আন্তর্জাতিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘রিপ্যাট্রিয়েশন অব মোর্টাল রিমেইনস’।
কীভাবে এই জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং এতে কত খরচ পড়ে, তার একটি বিস্তারিত চিত্র এখানে তুলে ধরা হলো।
আরও
মরদেহ পরিবহনের প্রথম শর্ত হলো প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করা। মৃত্যু স্বাভাবিক হোক বা অস্বাভাবিক, প্রথমেই হাসপাতাল থেকে মৃত্যুসনদ সংগ্রহ করতে হয়। এরপর প্রয়োজন হয় স্থানীয় থানার অনাপত্তিপত্র বা এনওসি। যদি মৃত্যুটি দুর্ঘটনাজনিত হয়, তবে পুলিশি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরিবহনের অনুমতি পাওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস বা কনস্যুলেটের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক।
মৃতদেহ সংরক্ষণ
দূরপাল্লার যাত্রায় মৃতদেহ পচন রোধে এবং সংক্রমণ এড়াতে এমবাম্বিং করা বাধ্যতামূলক। বিশেষ রাসায়নিকের মাধ্যমে দেহটি সংরক্ষিত করার পর হাসপাতাল থেকে একটি এমবাম্বিং সার্টিফিকেট দেওয়া হয়।
এরপর মরদেহটিকে বিশেষ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কফিনে রাখা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, কফিনটি হতে হবে ‘এয়ারটাইট’। এর ভেতরে সাধারণত জিংক বা ধাতব স্তর থাকে এবং বাইরে কাঠ বা ফাইবারের শক্ত আবরণ দেওয়া হয়। এরপর কফিনটি সিল করে প্যাকেজিং সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হয়।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা
বিমানে মরদেহ বুকিং দেওয়ার আগে বেশ কিছু নথিপত্র প্রস্তুত রাখতে হয়- মূল মৃত্যুসনদ (ইংরেজিতে), এমবাম্বিং ও কফিন সিলিং সার্টিফিকেট, পুলিশের অনাপত্তিপত্র, মৃত ব্যক্তির পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি,আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দূতাবাসের অনুমতিপত্র, মরদেহ গ্রহণকারী ব্যক্তির পরিচয়পত্র।
এয়ারলাইন্স প্রক্রিয়া
বেশিরভাগ এয়ারলাইন্স মৃতদেহকে যাত্রী হিসেবে নয়, বরং ‘এয়ার কার্গো’ হিসেবে পরিবহন করে। তবে যাত্রী সাধারণের অগোচরে এটি আলাদা কার্গো হোল্ডে অত্যন্ত সম্মানের সাথে রাখা হয়। ফ্লাইট ছাড়ার অন্তত ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা আগে কার্গো টার্মিনালে কফিন জমা দিতে হয়। এরপর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে ‘এয়ার ওয়ে বিল’ তৈরি করা হয়।
খরচ কেমন হতে পারে?
দূরত্ব এবং এয়ারলাইন্সের নীতিমালা অনুযায়ী খরচের ভিন্নতা দেখা যায়। দেশের ভেতরে এমবাম্বিং, কফিন এবং কার্গো বিল মিলিয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
দেশ ও দূরত্বভেদে এই খরচ ১ লাখ টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এর সাথে যুক্ত হয় কাস্টমস চার্জ এবং দূতাবাস ফি। অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসীদের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার বা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড আর্থিক সহায়তা প্রদান করে থাকে।
বিমানযোগে মরদেহ পরিবহন একটি সংবেদনশীল ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া। নথিপত্রের সামান্য ভুল পুরো প্রক্রিয়াটিকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। তাই শোকের মুহূর্তে ভোগান্তি এড়াতে অভিজ্ঞ কোনো এজেন্সি বা সরাসরি এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।











