সৌদি আরবে কীটনাশক ছিটানো বা পেস্ট কন্ট্রোল কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত মাসিক বেতন মাত্র ৭০০ সৌদি রিয়াল—বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২২ হাজার টাকা। প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজের ভিত্তিতে দুই বছরের চুক্তিতে মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। তবে আবাসন, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিলে দেশে পাঠানোর মতো অবশিষ্ট থাকে মাত্র তিন লাখ টাকার সামান্য বেশি। অর্থাৎ দুই বছর কাজ করেও শ্রমিকের প্রকৃত সঞ্চয় সীমিতই থাকে।
অন্যদিকে বিদেশযাত্রার প্রকৃত ব্যয় এই আয়ের তুলনায় অনেক বেশি। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো একজন শ্রমিকের কাছ থেকে প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নেয়। এর সঙ্গে পাসপোর্ট, মেডিকেল, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, প্রশিক্ষণ (PDO, তাকামুল) এবং বিভিন্ন সাব-এজেন্টের কমিশন মিলিয়ে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ফলে দুই বছরের মোট আয়ের তুলনায় শ্রমিকদের ঘাটতি থাকে প্রায় আড়াই লাখ টাকা। অনেকেরই এই ঘাটতি পোষাতে ভিসার মেয়াদ দ্বিগুণ করে চার বছর পর্যন্ত কাজ করতে হয়, প্রায় কোনো লাভ ছাড়াই; যা আধুনিক দাসব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
দেশজুড়ে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ফেনী, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও সিলেট অঞ্চলের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি বিদেশে যান। বিপরীতে রংপুর বিভাগের জেলাগুলো থেকে শ্রম অভিবাসনের হার তুলনামূলকভাবে কম। বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক দৈন্য নয়; বরং কাঠামোগত বহু সমস্যার ফল। এসব অঞ্চলে শক্তিশালী প্রবাসী নেটওয়ার্ক নেই, বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি অপ্রতুল, প্রাথমিক ব্যয় জোগাড় করার সামর্থ্য সীমিত, শিক্ষা ও দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে এবং বিদেশযাত্রা সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়াও কঠিন। দালালচক্রের প্রতারণা-ভীতি অনেক পরিবারকে বিদেশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত থেকে দূরে রাখে।
আরও
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশযাত্রা সহজ করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও নীতির কার্যকারিতা দুর্বল। উদাহরণ হিসেবে বলতে হয় মালয়েশিয়ার জিটুজি পদ্ধতির কথা—যেখানে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা ব্যয়ে শ্রমিক পাঠানো সম্ভব ছিল। কিন্তু রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরোধিতায় সেই উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায়। সৌদি আরবের আইনে নিয়োগ ব্যয় নিয়োগদাতার বহন করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয় না; এ নিয়মনীতির কার্যকর তদারকি ও প্রয়োগেও ব্যর্থতা দেখা যায়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও শ্রম অভিবাসন খাতে মৌলিক সংস্কার হয়নি। ফলে শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার বদলে মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠীর প্রভাবই নীতিনির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখছে। বিদেশযাত্রা সহজীকরণ, ব্যয় কমানো, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিদেশযাত্রা লাভজনক সম্ভাবনার বদলে দাসসদৃশ শোষণের ফাঁদেই আটকে থাকবে।











