যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের বিশাল ব্যয়ভার কীভাবে মেটানো হবে, তা নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। হোয়াইট হাউস ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের খরচের দায় আরব দেশগুলোর ওপর চাপানোর কথা ভাবছেন। এতে করে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের ওপর যেমন চাপ তৈরি হবে, তেমনি সেখানকার কূটনৈতিক সমীকরণও নতুন রূপ নিতে পারে।
সোমবার (৩০ মার্চ) সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের মতো এবারও আরব দেশগুলোকে এই ব্যয় বহন করতে হবে কি না। জবাবে ট্রাম্পের মুখপাত্র ক্যারোলিন লিভিট জানান, প্রেসিডেন্ট এ বিষয়ে তাদের কাছে দাবি জানানোর ব্যাপারে বেশ আগ্রহী। তিনি এখনই বিস্তারিত কিছু না জানালেও বলেন, ট্রাম্পের এমন চিন্তাভাবনা রয়েছে এবং ভবিষ্যতে তার মুখ থেকে এ বিষয়ে আরও শোনা যাবে।
উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালে কুয়েতে ইরাকি আগ্রাসনের পর যুক্তরাষ্ট্র একটি বহুজাতিক জোট গঠন করে জার্মানি ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে প্রায় ৫৪ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছিল, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৩৪ বিলিয়ন ডলার। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। মিত্র কিংবা আঞ্চলিক দেশগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একতরফাভাবে ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ শুরু করেছে।
চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্পঘনিষ্ঠ ডানপন্থি বিশ্লেষক শন হ্যানিটি মত দেন যে, যেকোনো যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে ইরানকেই তেলের মাধ্যমে পুরো সামরিক অভিযানের খরচ মেটাতে বাধ্য করা উচিত। অন্যদিকে ইরানও তাদের ক্ষতির জন্য উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। ইরানের দেওয়া তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত দুই সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। নিহতদের তালিকায় সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এবং অন্তত ২১৬ জন শিশু রয়েছে। পাশাপাশি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থাপনাও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।
পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানও ইসরায়েল এবং যেসব আঞ্চলিক দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেখানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, তারা কেবল মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতেই হামলা চালাচ্ছে। তবে বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশে বিমানবন্দর, হোটেল এবং জ্বালানি অবকাঠামোর মতো বেসামরিক স্থাপনাতেও তেহরানের হামলার জেরে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামে ঊর্ধ্বগতি ও আর্থিক বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবং সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার এবং ১২তম দিনে ১৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। বর্তমানে যুদ্ধ ৩১তম দিনে গড়ানোয় এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও অনেকগুণ বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় পেন্টাগনের অস্ত্রের ঘাটতি মেটাতে এবং যুদ্ধব্যয় নির্বাহের জন্য হোয়াইট হাউস কংগ্রেসের কাছে আরও অন্তত ২০০ বিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেট প্রস্তাব করেছে।
আরও
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে প্রভাব পড়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম ১ ডলারের বেশি বেড়ে বর্তমানে ৩ দশমিক ৯৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে ক্যারোলিন লিভিট এই মূল্যবৃদ্ধিকে সাময়িক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, স্বল্পমেয়াদের এই পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদে মিত্র ও মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তার স্বার্থে ইরানের হুমকি দূর করতে সাহায্য করবে। তবে তেহরানের দাবি, তারা ওই অঞ্চলের বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি ছিল না এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাঝপথেই তাদের ওপর এই হামলা চালানো হয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা










