জেনারেশন জেডের তথা ‘জেন জি’র উল্লেখযোগ্য অংশের পুরুষ এখনও দাম্পত্য জীবনে পুরুষের প্রাধান্যকে সমর্থন করেন। বিশ্বব্যাপী চালানো নতুন এক গবেষণায় এই চিত্রই দেখা গেছে। জরিপে অংশ নেয়া প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ পুরুষ মনে করেন, স্ত্রীর উচিত স্বামীর কথা মেনে চলা এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব স্বামীর হাতেই থাকা উচিত।
সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট বলছে, বিশ্বের ২৯টি দেশের প্রায় ২৩ হাজার মানুষের ওপর এই জরিপ পরিচালনা করা হয়। বৈশ্বিক এই জরিপে পুরুষদের বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির বড় পার্থক্য উঠে এসেছে। জেনারেশন জেডের পুরুষদের (যাদের জন্ম ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে) মধ্যে বিবাহে ঐতিহ্যগত সিদ্ধান্ত নেয়ার ধারণা সমর্থনের প্রবণতা বেবি বুমার প্রজন্মের পুরুষদের (১৯৪৬ থেকে ১৯৬৪ সালে জন্ম) তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
এই বিষয়ে বেবি বুমার পুরুষদের যথাক্রমে ১৩ ও ১৭ শতাংশ ওই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়েছেন। অন্যদিকে জেনারেশন জেডের নারীদের মধ্যে মাত্র ১৮ শতাংশ মনে করেন— স্ত্রীর সব সময় স্বামীর কথা মানা উচিত। বেবি বুমার নারীদের মধ্যে এ মতের সমর্থন ছিল মাত্র ৬ শতাংশ।কিংস বিজনেস স্কুলের গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ফর উইমেনস লিডারশিপের চেয়ার জুলিয়া গিলার্ড বলেন, তরুণ পুরুষদের মধ্যে লিঙ্গসমতার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব আরও বেশি না হওয়াটা উদ্বেগজনক।
আরও
তার ভাষায়, ‘অনেক জেন জেড পুরুষ শুধু নারীদের জন্য সীমাবদ্ধ প্রত্যাশা তৈরি করছেন না, তারা নিজেরাও কঠোর লিঙ্গভিত্তিক ধারণার মধ্যে আটকে যাচ্ছেন। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন সবাই লিঙ্গসমতার যাত্রায় যুক্ত থাকে এবং বুঝতে পারে এটি পুরো সমাজের জন্যই উপকারী।’
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে যুক্তরাজ্যের ইপসস এবং কিংস কলেজ লন্ডনের কিংস বিজনেস স্কুলের গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ফর উইমেনস লিডারশিপ যৌথভাবে এই জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে আরও দেখা যায়, জেনারেশন জেডের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পুরুষ মনে করেন নারীদের খুব বেশি স্বাধীন বা স্বনির্ভর হিসেবে দেখা উচিত নয়। জেনারেশন জেডের নারীদের মধ্যে এ মতের সমর্থন মাত্র ১৫ শতাংশ।
তবে একই সঙ্গে দেখা গেছে, সফল ক্যারিয়ার থাকা নারী পুরুষদের কাছে বেশি আকর্ষণীয়— এমন ধারণা জেনারেশন জেড পুরুষদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি। তাদের ৪১ শতাংশ এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়েছেন, যেখানে বেবি বুমার প্রজন্মের নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যে এ হার ২৭ শতাংশ।
সাধারণভাবে মানুষ তুলনামূলক সমতাভিত্তিক মতামতও প্রকাশ করেছেন। জরিপে অংশ নেয়া প্রতি ছয়জনের একজন মনে করেন নারীদেরই সন্তানের দেখভালের বেশির ভাগ দায়িত্ব নেয়া উচিত (১৭ শতাংশ) অথবা গৃহস্থালির অন্য কাজের বড় অংশই নারীদের করা উচিত (১৬ শতাংশ)। আর প্রায় এক-চতুর্থাংশের কম মানুষ (২৪ শতাংশ) মনে করেন পরিবারের আয় করার প্রধান দায়িত্ব পুরুষদের হওয়া উচিত।
যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণকারীরা ব্যক্তিগতভাবে ঐতিহ্যগত গৃহস্থালি দায়িত্বের ধারণা তুলনামূলক কম সমর্থন করেছেন। তবে তারা মনে করেন সমাজে এখনও এমন প্রত্যাশা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মাত্র ১৪ শতাংশ মনে করেন নারীদের সন্তানের দেখভালের প্রধান দায়িত্ব নেয়া উচিত। কিন্তু ৪৩ শতাংশ মনে করেন সমাজে নারীদের কাছ থেকে এমন প্রত্যাশাই করা হয়। একইভাবে ১৫ শতাংশ মনে করেন পরিবারের আয় করার দায়িত্ব পুরুষদের, কিন্তু ৩৮ শতাংশ মনে করেন সমাজ পুরুষদের কাছ থেকে এ দায়িত্ব আশা করে।
কিংস কলেজ লন্ডনের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ১৯ বছর বয়সী কেন ব্র্যাডি বলেন, এই ফলাফল তাকে খুব একটা অবাক করেনি। তার মতে, অনেক তরুণ পুরুষ এমন অনলাইন পরিবেশে বড় হচ্ছে যেখানে পুরুষত্ব নিয়ে নিয়মিত বিতর্ক হয়।
তিনি বলেন, ‘অনলাইন স্পেস, বিশেষ করে যেগুলোকে প্রায়ই ‘ম্যানোস্ফিয়ার’ বলা হয়, সেখানে লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা নিয়ে খুব ঐতিহ্যগত ধারণা বারবার পুনরাবৃত্তি হয়। কেউ যদি বারবার এসবের মুখোমুখি হয়, তাহলে সম্পর্ক বা পুরুষত্ব সম্পর্কে তার চিন্তাভাবনা প্রভাবিত হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, অনলাইনের আলোচনা ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে বড় পার্থক্য থাকতে পারে। তার মতে, অনলাইনে যে মতামতগুলো বেশি জোরে শোনা যায়, সেগুলো অনেক সময় সবচেয়ে চরম অবস্থানের হয়, ফলে বাস্তবের তুলনায় সেগুলো বেশি সাধারণ বলে মনে হতে পারে।
কিংস কলেজ লন্ডনের কিংস বিজনেস স্কুলের গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ফর উইমেনস লিডারশিপের পরিচালক অধ্যাপক হিজুং চুংও মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণ পুরুষদের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনীতির অনেক পুরুষ প্রভাবশালী ব্যক্তি পুরুষ হওয়া মানে কী, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ঐতিহ্যগত লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকার ওপর জোর দেন।’ তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব প্রভাবশালীদের দৃশ্যমানতা ও প্রভাবের কারণেই অনেক তরুণ পুরুষ আরও রক্ষণশীল হয়ে উঠছেন এবং তারা সমাজে প্রচলিত ধারণা মেনে চলার চাপ অনুভব করছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘লিঙ্গসমতার জন্য লড়াই মানে শুধু কিছু নারীকে পুরুষদের চেয়ে উঁচু পদে বসানো নয়। এর অর্থ হলো নারী-পুরুষ একসঙ্গে সমাজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সরকারকে চ্যালেঞ্জ করা, যাতে সবার জন্য আরও বেশি সুযোগ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।’











