মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে একটি রহস্যময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট। সম্প্রতি আলী খামেনি–এর ভেরিফাইড এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে হঠাৎ একটি পোস্ট প্রকাশিত হওয়ার পর শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। কারণ এর কয়েকদিন আগেই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল।
শুক্রবার ভোরে ওই ভেরিফাইড অ্যাকাউন্টে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ছবি পোস্ট করা হয়। ছবির সঙ্গে ফার্সি ভাষায় লেখা ছিল—‘খোররামশাহারের মুহূর্ত এখন দিগন্তে’। সংক্ষিপ্ত এই বার্তাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে এবং নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে।
“খোররামশাহার” নামটি সাধারণ কোনো শব্দ নয়। এটি ইরানের অন্যতম শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র—খোররামশাহর ক্ষেপণাস্ত্র। প্রায় ১৩ মিটার লম্বা এই ক্ষেপণাস্ত্র ১০০০ থেকে ২০০০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম এবং প্রায় ১৮০০ কেজি ওজনের ওয়ারহেড বহন করতে পারে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্ত্রের মাধ্যমে মুহূর্তেই শত্রুর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে ধ্বংস করা সম্ভব।
আরও
পোস্টে ব্যবহৃত ছবিতেও ছিল একই ধরনের ইঙ্গিত। সেখানে ফার্সি ভাষায় দাবি করা হয়, এই অস্ত্র ইরানের তরুণদের হাতে তৈরি এবং এটি জায়নবাদী শাসনের হৃদপিণ্ড গুড়িয়ে দিতে সক্ষম।
এই পোস্টের মাত্র একদিন আগেই ইসরাইলে বড় ধরনের হামলার খবর সামনে আসে। তেল আবিবের কাছে অবস্থিত বেন গুরিওন বিমানবন্দর এবং আশপাশের একটি বিমান ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয় বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে। ইসরাইলি
সামরিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় খোররামশাহার-৪ ধরনের মিসাইল ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ইরানের সামরিক বাহিনী এই হামলার দায়ও স্বীকার করেছে।
ঘটনার পরপরই উদ্বেগ বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নিরাপত্তা মহলে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর ঘোষিত সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে। অপারেশন এপিক ফিউরি” নামে আলোচিত পরিকল্পনাটি হয়তো বড় কোনো কৌশলগত সামরিক পদক্ষেপ নয়; বরং আসন্ন নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের একটি কৌশল হতে পারে।
তবে সবচেয়ে বড় রহস্য থেকে গেছে একটি প্রশ্নকে ঘিরে—যদি খামেনি সত্যিই মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে তার ভেরিফাইড এক্স অ্যাকাউন্টটি পরিচালনা করছে কে?
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন,ইরানের সামরিক বা রাজনৈতিক অঙ্গনের কোনো কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে। আবার অন্যদের মতে,এটি হতে পারে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ—যেখানে মৃত বা অনুপস্থিত নেতার ডিজিটাল উপস্থিতিকেই ব্যবহার করা হচ্ছে ভয় ও বিভ্রান্তি তৈরির অস্ত্র হিসেবে।
এই ঘটনার প্রভাব শুধু রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ববাজারেও এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
ভারত মহাসাগর থেকে শুরু করে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিভিন্ন নৌপথে সামরিক তৎপরতা ইতোমধ্যেই বাড়ানো হয়েছে। এমনকি ভারতের কিছু নৌঘাঁটি ব্যবহারের গুজবও ছড়িয়েছে, যদিও এখনো তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
একটি রহস্যময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট আবারও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—ডিজিটাল যুগে কি সত্যিই মৃত নেতার কণ্ঠও নতুন করে যুদ্ধের বার্তা বহন করতে পারে?











