বল-বিয়ারিং লাগানো চাকার একটি লোহার ঠেলাগাড়িতে বসে থাকেন তিনি। কাঁধে একটি ব্যাকপ্যাক, হাত দুটি জুতার ভেতরে ঢোকানো। ভারতের মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরের ব্যস্ত সরাফা বাজারে নিজেকে ঠেলে ঠেলে এগিয়ে যান। পথচারীদের কাছে ভিক্ষা চান না; বরং এমনভাবে বসে থাকেন, যাতে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ওই দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করতে একটি কয়েন বা নোট ফেলে দেন। এই ব্যক্তির নাম মাঙ্গিলাল। তিনি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী কোটিপতি; যার নামে সরকারি বরাদ্দের একটি বাড়িসহ মোট তিনটি বাড়ি, তিনটি অটোরিকশা এবং একটি মারুতি সুজুকি ডিজায়ার গাড়ি রয়েছে।
রাজ্যের নারী ও শিশু উন্নয়ন দপ্তরের ভিক্ষুকবিরোধী অভিযানের সময় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। ইন্দোরকে ভিক্ষুকমুক্ত করার চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে শনিবার গভীর রাতে উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা মাঙ্গিলালকে তুলে নিয়ে যায়। সরাফা এলাকায় নিয়মিত ভিক্ষা করা এক কুষ্ঠরোগী সম্পর্কে তথ্য পেয়ে অভিযান শুরু করা হয়েছিল। অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা শুরুতে এই ঘটনাকে একটি সাধারণ ঘটনা বলেই ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু তদন্তে উঠে আসে রূপকথার গল্পের মতো এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা।
বছরের পর বছর ধরে মাঙ্গিলাল নীরব ভিক্ষার কৌশল রপ্ত করেছিলেন। তিনি কখনো কিছু চাইতেন না। শুধু নিজের লোহার গাড়িতে বসে থাকতেন। বাকিটা করত মানুষের সহানুভূতি। মানুষ স্বেচ্ছায় দান করত। শুধু ভিক্ষা থেকেই তার দৈনিক আয় হতো প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।
আরও
তবে তদন্তকারীদের মতে, আসল কাজ শুরু হতো রাত নামার পর। জিজ্ঞাসাবাদে মাঙ্গিলাল স্বীকার করেন, ভিক্ষা থেকে পাওয়া অর্থ জীবিকা নির্বাহে নয়, বরং সরাফা বাজারেই বিনিয়োগ করতেন তিনি। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের এক দিন বা এক সপ্তাহের জন্য টাকা ধার দিতেন এবং সুদ আদায় করতেন, যা তিনি নিজেই প্রতিদিন সন্ধ্যায় সংগ্রহ করতেন। কর্মকর্তাদের ধারণা, তিনি ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা ধার দিয়েছেন এবং সুদসহ প্রতিদিন আয় করতেন প্রায় ১ থেকে ২ হাজার টাকা।
যাকে এতদিন নিঃস্ব বলে মনে করা হতো, সেই ব্যক্তি আসলে শহরের ভালো এলাকায় তিনটি বাড়ির মালিক—এর মধ্যে একটি তিনতলা ভবন। তার রয়েছে তিনটি অটোরিকশা, যেগুলো দৈনিক ভাড়ায় চালানো হয় এবং একটি মারুতি সুজুকি ডিজায়ার গাড়ি, যেটি তিনি নিজে না চালিয়ে ভাড়ায় দেন বলে জানা গেছে। এমনকি প্রতিবন্ধী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর আবাস যোজনার (পিএমএওয়াই) আওতায় একটি এক বেডরুম, হল ও রান্নাঘরসহ (১ বিএইচকে) ফ্ল্যাটও পেয়েছেন। যদিও তার আগেই একাধিক সম্পত্তি ছিল।
উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া রাজ্যের নারী ও শিশু উন্নয়ন দপ্তরের কর্মকর্তা দীনেশ মিশ্র বলেন, মাঙ্গিলালকে বর্তমানে উজ্জয়িনীর সেবাধাম আশ্রমে পাঠানো হয়েছে। তার ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তির তদন্ত চলছে। যারা তার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছেন, সেই ব্যবসায়ীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
অভিযান ও তদন্তের বিস্তারিত তুলে ধরে মিশ্র বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে মাঙ্গিলাল স্বীকার করেছেন, ভিক্ষা থেকে পাওয়া টাকা সরাফা এলাকার কিছু ব্যবসায়ীকে সুদে ধার দিতেন তিনি। এক দিন বা এক সপ্তাহের জন্য টাকা দিতেন এবং প্রতিদিন সরাফা এলাকায় এসে সুদ আদায় করতেন।
তিনি বলেন, সরাফা এলাকায় প্রায় প্রতি সপ্তাহে ভিক্ষা করা মাঙ্গিলাল নামের এক ব্যক্তি কুষ্ঠরোগী বলে শনিবার রাত ১০টায় উদ্ধারকারী দল তথ্য পায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দলটি রাত ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বাইরে অপেক্ষা করে এবং তাকে উদ্ধার করে। পরে তার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে জানা যায়, মাঙ্গিলালের তিনটি বাড়ি রয়েছে—এর একটি তিনতলা, বাকি দুটি একতলা, সবকটিই ভালো এলাকায় অবস্থিত। তার তিনটি অটোরিকশা রয়েছে, যেগুলো তিনি ভাড়ায় চালান। এছাড়া তার একটি মারুতি সুজুকি ডিজায়ার গাড়িও রয়েছে, যেটি তিনি যাতায়াতের কাজে ব্যবহার করেন।
২০২১-২২ সাল থেকে ভিক্ষা করছেন মাঙ্গিলাল। বর্তমানে তাকে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তার বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত করে কালেক্টরের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মিশ্র।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইন্দোরের ভিক্ষুকবিরোধী অভিযানে এই ঘটনা এক অপ্রত্যাশিত অধ্যায় যোগ করেছে। সরকারি এক সমীক্ষা অনুযায়ী, মধ্যপ্রদেশের ওই শহরে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার ভিক্ষুক রয়েছেন। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫০০ জন কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে ভিক্ষা ছাড়তে সম্মত হয়েছেন, ১ হাজার ৬০০ জনকে উদ্ধার করে পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্রেরণ এবং ১৭২ জন শিশুকে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি।










