সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দখলদার ইসরায়েলের সঙ্গে পারমাণবিক শক্তিধর একমাত্র মুসলিম দেশ পাকিস্তানের প্রকাশ্য ও গোপন যোগাযোগ অভূতপূর্ব মাত্রায় বেড়েছে। দুই দেশের কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক প্রকাশ্য সাক্ষাৎ, প্রতীকী রাজনৈতিক ইঙ্গিত এবং সমন্বিত আঞ্চলিক কূটনীতি ইঙ্গিত দিচ্ছে- ভূরাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে।
এ ঘটনাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্থাপনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস ২.০’-এর প্রসারণ পরিকল্পনার সঙ্গে।
যদিও জনপ্রিয় বিশ্লেষণগুলোতে প্রায়ই বলা হয়- পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভারতের যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব না দেওয়া বা নয়াদিল্লির রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কেনা- এসবের কারণে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রতি উষ্ণ হয়েছে, কিন্তু এসব ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। এগুলো শুধু দ্বিপাক্ষিক বা অর্থনৈতিক দিককে গুরুত্ব দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের গভীরতর কৌশলগত ও প্রতীকী বিবেচনাগুলোকে উপেক্ষা করে। এর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তানের পারমাণবিক অবস্থান, মুসলিম বিশ্বের জনমতের ওপর এর প্রভাব এবং গাজাপরবর্তী আঞ্চলিক পুনর্গঠন।
আরও
আরও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ দেখা যায়- এ প্রক্রিয়ায় তিনটি প্রধান পক্ষ রয়েছে। তারা হলো- পাকিস্তান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে ওয়াশিংটন কৌশলগতভাবে ইসলামাবাদকে ইসরায়েলকে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে এবং একই সঙ্গে নিজের আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ স্বার্থও ভারসাম্য বজায় রাখছে।
এ নীতিগত পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিতগুলো চলতি নভেম্বর মাসে, পাকিস্তানি ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের অস্বাভাবিকভাবে প্রকাশ্য সাক্ষাতে দেখা যায়।
গত ৪ নভেম্বর যুক্তরাজ্যের লন্ডনের ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল মার্কেট ফেয়ারে ইসরায়েলের পর্যটন বিভাগের মহাপরিচালক মাইকেল ইজাকভ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সারদার ইয়াসির ইলিয়াস খানের সঙ্গে প্রকাশ্যে সাক্ষাৎ করেন তদ্রে এই সাক্ষাতের ছবি ব্যাপক ভাবে প্রচারিত হয়েছে। দুদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও এই প্রকাশ্য কুশল বিনিময় ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। যা উভয় পক্ষের ‘অসম্ভব’ দৃশ্যকল্পকে স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত দেয়।
এরআগে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্ক সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে আমেরিকান জিউইশ কংগ্রেসের (এজেসি) প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল রোজেনের একটি নীরব সাক্ষাৎ হয়েছে বলে নিউইয়র্কের কূটনৈতিক মহলে খবর ছড়ায়।
যদিও ইসলামাবাদ কিংবা এজেসি কেউই এটি প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে তা প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু অস্বীকার না করায় ধারণা আরও দৃঢ় হয় যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ আড়ালে চলছে। এসব ঘটনাই মিলে একটি বৃহত্তর প্রবণতা তৈরি করে- পরোক্ষ যোগাযোগের বিস্তার এবং নীরব অনুসন্ধানী কূটনীতি।
গত ১৩ অক্টোবর মিসরের শারম আল-শেখে গাজা সম্মেলন এ নতুন ভূমিকাকে আরও জোরালো করে। গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকটি ‘মুসলিম ঐক্যের’ প্রদর্শন হিসেবে উপস্থাপিত হলেও সংঘাতে জড়িত মূল পক্ষ ইসরায়েল ও হামাসকে বাদ দিয়ে এটি মূলত প্রতীকী ছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে সংহত করা এবং আঞ্চলিক সমন্বয় প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই আয়োজন করা হয়েছিল।
এটি দেখায় কীভাবে ওয়াশিংটন পাকিস্তানসহ গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রবান্ধব বয়ানের পক্ষে সাজিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে, মানবিক সহায়তা সমন্বয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং নিজের আঞ্চলিক কাঠামোকে আরও মজবুত করেছে। সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয় এমন এক সময়ে, যখন পৃথিবীর নানা স্থানে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে।
অন্যদিকে চলতি বছরই সাংবাদিক, গবেষক এবং প্রভাবশালীদের ১০ সদস্যের একটি পাকিস্তানি প্রতিনিধি দল ইসরায়েল সফর করেছিলেন। তাদের এই সফরের লক্ষ্য ছিল সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করা এবং ইসরায়েল সম্পর্কে প্রচলিত বর্ণনাকে চ্যালেঞ্জ করা, যদিও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতর এই সফরের কোনও আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে।
প্রতিনিধি দলের সবাই এই সফরকে জ্ঞানগর্ভ বলে বর্ণনা করেছেন এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক বোঝাপড়ার ওপর জোর দিয়েছেন, তবে করাচি প্রেস ক্লাবের মতো দেশীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো এই সফরের নিন্দা জানিয়েছে।
পাকিস্তানকে কেন প্রয়োজন ইসরায়েলের?
ইসরায়েলের কাছে পাকিস্তান কেবল আরেকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র নয়। বরং এটিই একমাত্র মুসলিম দেশ যেখানে পারমাণবিক অস্ত্র এবং দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে এবং এটি এমন একটি জনসাধারণের আবাসস্থল যেখানে ইসরায়েলের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ রয়েছে।
ইসরায়েলি কৌশলগত পরিকল্পনাকারীরা পাকিস্তানকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছেন, এমনকি কিছু ইসরায়েলি চিন্তাবিদ পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিরপেক্ষ করার জন্য ভারতের সঙ্গে কাজ করার ওপরেও জোর দিয়েছেন- যদিও এই ধারণাটি ভারত প্রত্যাখ্যান করেছিল।
অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বে ইসরায়েল-বিরোধী মনোভাব পরির্বতের জন্য পাকিস্তানকে পাশে চায় তেলআবিব, কারণ গত দুই বছরে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের ফলে আন্তর্জাতিকভাবে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইসরায়েলের চোখে পাকিস্তান সেই প্রভাবশালী একটি রাষ্ট্র, যার সঙ্গে সুসর্ম্পক ইসলামীবিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি পথ দেখাবে।
পাকিস্তানের স্বার্থ কী?
ইসরায়েলর সঙ্গে সুসর্ম্পক রাখার জন্য পাকিস্তানেরও নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে, বিশেষ করে গত মে মাসে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন সিন্দুরের’ সময় ভারতকে ইসরায়েলের সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বৃদ্ধি ইসলামাবাদের নিরাপত্তা উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও নিশ্চিত করেছেন, ইসরায়েল ভারতকে হার্পি ড্রোন এবং বারাক-৮ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। একই সঙ্গে প্রকাশ্যে তাদের কার্যক্ষমতার প্রশংসা করেছেন।
ভারত ইসরায়েলি অস্ত্র দিয়ে তার আক্রমণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করছে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগিকে হুমকি হিসেবে দেখছেন পাকিস্তানি নীতিনিধারকরা। ইসলামাবাদের জন্য ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ এই ক্রমবর্ধমান ভারত-ইসরায়েলি বলয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
ইসলামাবাদ পলিসি ইনস্টিটিউট (আইপিআই), ইনস্টিটিউট অফ পলিসি স্টাডিজ (আইপিএস), স্ট্র্যাটেজিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (সিআইএসএস) এবং ইনস্টিটিউট অফ স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ ইসলামাবাদ (আইএসএসআই)সহ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এবং নীতি বিশ্লেষণ সূত্রগুলো বলছে, ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের গভীর অংশীদারিত্ব ক্রমবর্ধমানভাবে পাকিস্তানের নিরাপত্তা কৌশল এবং সতর্ক কিন্তু বিকশিত পররাষ্ট্র নীতি পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সূত্র: এশিয়া টাইমস












