দীর্ঘ সাত বছরের অপেক্ষার অবসান হলো, সন্তানেরা ফিরে পেল তাদের মাকে। তবে এই ফেরা কোনো আনন্দদায়ক প্রত্যাবর্তন নয়; সৌদি আরবের প্রবাসজীবনে ঘটে যাওয়া অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেশে ফিরেছেন মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহাবাজপুর ইউনিয়নের মোহাম্মদ নগর গ্রামের বাসিন্দা রিজিয়া বেগম। গত মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর উত্তরায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০১৯ সালে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে ঢাকার ‘এটিবি ওভারসিজ লিমিটেড’ নামের একটি এজেন্সির সহায়তায় সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন রিজিয়া। সেখানে যাওয়ার পর থেকেই তিনি নিয়োগকর্তার চরম শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। দালালের কাছে বারবার অভিযোগ জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। একপর্যায়ে ২০২১ সালের পর থেকে পরিবারের সঙ্গে তাঁর সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘদিন কোনো খোঁজ না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা একপ্রকার ধরেই নিয়েছিলেন যে তিনি আর বেঁচে নেই। অবশেষে গত সোমবার ব্র্যাকের কর্মীরা বাড়িতে গিয়ে তাঁর ফিরে আসার খবর দেন। মায়ের এমন করুণ পরিণতি দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন মেয়ে লিজা আক্তার। তিনি আক্ষেপ করে জানান, নির্যাতনের কারণে তাঁর মায়ের চেহারা এতটাই বদলে গেছে যে তাঁকে চেনাই দায়, আর তিনি এখন কারও সঙ্গেই কোনো কথা বলছেন না।
রিজিয়ার দেশে ফেরার এবং পরিচয় শনাক্তের বিষয়ে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বিস্তারিত জানান। গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সৌদি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন রিজিয়া। এ সময় তাঁর কাছে পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্রসহ ব্যক্তিগত কোনো নথিপত্র ছিল না। বিমানবন্দর থেকে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) তাঁকে ব্র্যাকের কাছে হস্তান্তর করে। পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদস্যরা তাঁর আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেন।
আরও
ব্র্যাক সেন্টারে রিজিয়াকে হস্তান্তরের দিন সেখানে আশ্রয় নেওয়া সৌদিফেরত রিমা আক্তার (ছদ্মনাম) নামের আরেক নারী তাঁর ওপর হওয়া ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। ছোটবেলায় মা–বাবা হারানো এই নারী অভাবের তাড়নায় সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে গিয়েছিলেন। কিন্তু কাজ দেওয়ার বদলে সেখানে তাঁকে চারবার বিক্রি করা হয় এবং চরম শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়। একপর্যায়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন এবং বিচারের বদলে গত ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ তাঁকে ব্র্যাকের নিরাপদ আবাসনে হস্তান্তর করে। মানব পাচারের শিকার এই নারী এখন নিজের ও অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
প্রবাসী কর্মীদের এমন মর্মান্তিক পরিণতির বিষয়ে পিবিআইর অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, অপরাধী শনাক্তকরণে পিবিআই নিয়মিত কাজ করলেও বিদেশফেরত ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পরিচয় শনাক্তকরণে তাঁরা এবারই প্রথম কাজ করলেন। যেসব পাচারকারী চক্রের কারণে দেশের নারীদের বিদেশে গিয়ে এমন চরম দুর্ভোগ ও নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।












