ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ক্যানোপি এলাকা, আগমনী–বহির্গমন গেট, টার্মিনাল ভবনের সামনে এবং রানওয়ের আশপাশে ঝাঁকে ঝাঁকে মশা ওড়ে, ফলে যাত্রী ও তাদের স্বজনদের জন্য বিমানবন্দরে অবস্থান করা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়েছে। মশার আক্রমণে হাত-পা ছোড়া ছাড়া উপায় থাকে না, আর এক মিনিট স্থির হয়ে দাঁড়ানোও দুঃসাধ্য।

ইতালিগামী যাত্রীকে বিদায় জানাতে বিমানবন্দরে এসে শরীয়তপুরের আকতার হোসেন বলেন, “এভাবে মশা তাড়া করলে কেউ বিমানবন্দরে ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারবে না। মনে হয় কোনও মশার খামারে চলে এসেছি।” আগমনী টার্মিনালের পরিস্থিতি আরও শোচনীয়; যে কেউ কয়েক সেকেন্ড দাঁড়ালেই চারদিক থেকে মশা এসে কামড়াচ্ছে। যাত্রীরা অভিযোগ করেন, টার্মিনালের ভেতরেও মশার উপদ্রব কম নয় এবং মাঝে মাঝে মশা বিমানের ভেতরেও ঢুকে পড়ে। বাধ্য হয়ে কয়েকটি এয়ারলাইন্স উড়োজাহাজে মশা মারার ব্যাট রাখছে।
আরও
প্রতিদিন প্রায় ২০–২৫ হাজার যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন, আর স্বজন ও দর্শনার্থীর সংখ্যা ৬০–৭০ হাজার। দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক যাত্রীসেবা ব্যাহত হচ্ছে। বিমানবন্দরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত মশার দাপট সবচেয়ে বেশি থাকে। তবে চলতি মৌসুমে তা অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছেছে।


বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ জানান, “আমরা প্রথমবারের মতো এ বছর বড় ধরনের অভিযোগ শুনছি। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে টার্মিনালের ভেতরে লার্ভাসাইড জন্মাতে পারে না। সমস্যা হচ্ছে বাইরে থেকে উড়ে আসা মশা।” তিনি আরও বলেন, “বিমানবন্দর শহরের মাঝখানে, পাশে অনেক খোলা এলাকা ও জলাশয় রয়েছে। সেসব এলাকা সিটি করপোরেশনের আওতায়। আমরা তাদের চিঠি দিয়েছি।”
বেবিচকের পূর্বের এক বিজ্ঞপ্তিতেও বলা হয়েছিল, বিমানবন্দর আলোকিত হওয়ায় আশপাশ থেকে মশা এসে জমা হয়। ফলে বিমানবন্দরের বাইরে সমন্বিত মশকনিধন না হলে সমস্যা কাটবে না।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাসার, যিনি বেবিচকের পরামর্শকও, জানান—বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসংলগ্ন দুইটি লেক, হাজি ক্যাম্পের পেছনের বড় খাল এবং বাউনিয়া এলাকার অসংখ্য ব্যক্তিমালিকানাধীন ডোবায় বিপুল পরিমাণ কিউলেক্স মশার লার্ভা পাওয়া গেছে।


তার ভাষায়, “এসব জায়গায় কোটি কোটি লার্ভা রয়েছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ না করলে বিমানবন্দরের মশার উপদ্রব কমানো সম্ভব নয়। টার্মিনালের ভেতরে সমস্যা নেই, পুরো সমস্যা বাহিরে।”
তিনি আরও বলেন, “বাউনিয়া এলাকার ডোবা–নালাগুলো এখন মশার কারখানা। সেগুলো সিটি করপোরেশন নিয়মিত পরিষ্কার না করলে বিমানবন্দরে মশার দখল কমবে না।”
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, বিমানবন্দরের চারপাশে প্রায় ১৫টি খাল, বিল ও জলাভূমি রয়েছে—এর বেশিরভাগ সিভিল অ্যাভিয়েশন এবং কিছু সাধারণ বিমা করপোরেশনের মালিকানাধীন।
তিনি বলেন, “এসব জলাশয় থেকেই মশা জন্মায়। সিভিল অ্যাভিয়েশনের অনুমতি ছাড়া আমরা অনেক জায়গায় ওষুধ প্রয়োগ করতে পারি না। গত দুই বছর বিমানবন্দরে মশকনিধনের দায়িত্ব মূলত বেবিচক নিজেরাই নিয়েছে। আমরা শুধু মেশিন দিয়েছি।”


বিমানবন্দরের আশপাশের বাসিন্দারা জানায়, আশিয়ান সিটি, হাজি ক্যাম্প এলাকা, রেললাইন সংলগ্ন খাল, পরিত্যক্ত প্লট এবং জলাবদ্ধ স্থানে দিনের পর দিন ময়লা–আবর্জনা ও জমে থাকা পানিতে অনবরত মশা বিস্তার করছে। তারা অভিযোগ করেন, সিটি করপোরেশনের ফগার মেশিন খুব কম আসে এবং লার্ভা ধ্বংসে নিয়মিত কার্যক্রম নেই। একজন যাত্রী মন্তব্য করেন—“যা অবস্থা, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বদলে মনে হয় কোনো মাছ বাজারে এসেছি। মশার উপদ্রব লজ্জাজনক।”











