বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ২০২৫ সালে বড় ভরসা ছিল প্রবাস আয়। তবে এই অর্জনের আড়ালে স্পষ্ট হয়ে উঠছে জনশক্তি রপ্তানির এক ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতা। দেশের মোট অভিবাসী কর্মীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই গেছেন সৌদি আরবে। নতুন শ্রমবাজার না বাড়ায় এক দেশনির্ভর এই কাঠামো রেমিট্যান্স ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন মোট ১১ লাখ ৩১ হাজার ১৪৪ জন কর্মী। এর মধ্যে সাত লাখ ৫৪ হাজার ৬৫৪ জন গেছেন সৌদি আরবে, যা মোট অভিবাসীর প্রায় ৬৭ শতাংশ। এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কাতার। দেশটিতে গেছেন এক লাখ সাত হাজার ৬০০ জন কর্মী, যা মোট অভিবাসনের ১০ শতাংশ।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা সিঙ্গাপুরে গেছেন ৭০ হাজার ১৮২ জন (৬ শতাংশ)। কুয়েতে গেছেন ৪২ হাজার ৭৩৫ জন এবং মালদ্বীপে গেছেন ৪০ হাজার ১৫৯ জন কর্মী, যা মোট অভিবাসনের প্রায় ৪ শতাংশ করে।
এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেছেন ১৩ হাজার ৭৫২ জন, জর্দানে ১২ হাজার ৩০১ জন, কম্বোডিয়ায় ১২ হাজার ২৫১ জন, ইতালিতে ৯ হাজার ৩৬৫ জন এবং কিরগিজস্তানে গেছেন ছয় হাজার ৬৫০ জন কর্মী।
আরও
১৪১ দেশে গেলেও বাজার সীমিত : রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে কর্মীরা ১৪১টি দেশে অভিবাসন করেছেন। তবে এর ৯০ শতাংশই গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে। ১৪টি দেশে গেছেন মোট অভিবাসীর ৮ শতাংশ। বিপরীতে ১২৩টি দেশে গেছেন মাত্র ২ শতাংশ কর্মী। রামরু বলছে, ১৩টি দেশে একজন করে কর্মী গেছেন এবং ৩৪টি দেশে গেছেন ২ থেকে ১০ জন করে। যেসব দেশে ১০০ জনের কম অভিবাসী কর্মী যান, সেসব দেশকে কার্যকর শ্রমবাজার হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন।
ফ্রি ভিসা ও কর্মসংকট : সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সৌদি আরবে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের বড় অংশই যান ফ্রি ভিসায়। এসব কর্মীকে নিজেই কাজ জোগাড় করতে হয়। কিন্তু অতিরিক্ত কর্মী যাওয়ায় দেশটিতে কাজের সুযোগ ক্রমেই কমছে। ফ্রি ভিসায় যাওয়া অনেক কর্মী প্রত্যাশিত কাজ পাচ্ছেন না। এমনকি চুক্তিভিত্তিক কর্মীরাও অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত বেতন ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ছাড়া সৌদি আরবে বর্তমানে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশ থেকে মূলত অদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ কর্মী পাঠানো হয়। ফলে পাকিস্তান ও ভারতের শ্রমিকদের প্রতি দেশটির ঝোঁক বাড়ছে।
মালয়েশিয়ার বাজারও অনিশ্চিত : দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন। চার বছর বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালে বাজারটি খুললে ওই বছর যান ৫০ হাজার ৯০ জন। ২০২৩ সালে গেছেন তিন লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন। ২০২৪ সালে যান ৯৩ হাজার ৬৩২ জন। তবে ২০২৫ সালে মালয়েশিয়ায় গেছেন মাত্র তিন হাজার ৬৬ জন।
সূত্র জানায়, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেট এবং সেখানে কর্মসংস্থানের সংকটের কারণে ২০২৪ সালের জুনে আবারও কার্যত বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। দক্ষতাসংকট ও তাকামল পরীক্ষা : সৌদি আরবগামী বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য তাকামল পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০২৪ সালে ৫২টি পেশায় এই পরীক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা সনদ প্রয়োজন হলেও ২০২৫ সালে তা বাড়িয়ে ৭২টি পেশায় করা হয়েছে। বর্তমানে ২৭টি কেন্দ্রের মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।
তবে মাঠ পর্যায়ে পর্যাপ্ত কেন্দ্র, প্রশিক্ষক ও জনবল না থাকায় সব জেলায় কার্যকরভাবে এই পরীক্ষা বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব হয়নি। এতে অভিবাসন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি দালালচক্র পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার নামে কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে।
নারী অভিবাসন কমছে : ২০২৫ সালে বিদেশে গেছেন ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী কর্মী, যা মোট অভিবাসনের ৫.৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬১ হাজার ১৫৮। যদিও এক বছরে সংখ্যা সামান্য বেড়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতায় নারী অভিবাসন কমছে।
২০১৬ সালে মোট শ্রম অভিবাসনের ১৬ শতাংশই ছিল নারী। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর এক লাখের বেশি নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। ২০২২ সালে নারী অভিবাসন ছিল এক লাখ পাঁচ হাজার ৪৬৬ জন। কিন্তু ২০২৫ সালে তা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ৪০.০৯ শতাংশ কমেছে।
রেমিট্যান্সে সৌদি আরব শীর্ষে : ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের মধ্যে সর্বাধিক এসেছে সৌদি আরব থেকে—১৫.৫২ শতাংশ। এরপর রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (১২.৫৮ শতাংশ), যুক্তরাজ্য (১২.৩০ শতাংশ), যুক্তরাষ্ট্র (১১.০৩ শতাংশ), মালয়েশিয়া (১০.০৩ শতাংশ), ওমান (৫.৭৭ শতাংশ), ইতালি (৫.৭৬ শতাংশ), কুয়েত (৫.১৬ শতাংশ), কাতার (৪.২৮ শতাংশ) ও সিঙ্গাপুর (৩.৭৬ শতাংশ)।
রামরুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য এখনো বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস হলেও যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশের অবদান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অদক্ষ শ্রমের ফাঁদে বাংলাদেশ : বিএমইটি অভিবাসী কর্মীদের চার শ্রেণিতে ভাগ করে—পেশাজীবী, দক্ষ, আধাদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ। বাস্তবে বাংলাদেশ অংশ নিচ্ছে মূলত আধাদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ শ্রমবাজারে। রামরুর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পেশাজীবী কর্মীর হার ছিল ৩-৪ শতাংশ, দক্ষ কর্মী ২০ থেকে ২২ শতাংশ এবং বাকি ৭০ থেকে ৭৪ শতাংশ ছিলেন স্বল্পদক্ষ বা অদক্ষ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশিক্ষণের মান, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাব, বাজেটসংকট, জনবল ঘাটতি এবং রিক্রুটিং এজেন্সির অনাগ্রহের কারণে দক্ষ শ্রমিক তৈরি হচ্ছে না।
উদ্বেগের বার্তা : রামরুর নির্বাহী পরিচালক ড. তাসনিম সিদ্দিকী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের এক দেশকেন্দ্রিক শ্রমবাজার দীর্ঘদিনের সমস্যা। যখন এসব দেশে অতিরিক্ত কর্মী যান, তখনই বাজার বন্ধ হয়ে যায়—মালয়েশিয়া এবং ইউএই তার উদাহরণ। নতুন বাজার খোঁজার দায়িত্ব মূলত বেসরকারি খাতের, তবে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। কিন্তু সরকার, বায়রা কিংবা রিক্রুটিং এজেন্সি—কাউকেই কার্যকর ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে না।’
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘শ্রমবাজার মূলত সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের বাজার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। সৌদি আরবই এখন ভরসা। সেখানে সমস্যা হলে আমরা বড় বিপদে পড়ব।’













