তানজির শেখ ও সহপাঠীর বর্ণনা অনুযায়ী, লিবিয়ায় তাদের গুম করা হয়েছিল, আটকে রেখে লোহার রড দিয়ে পেটানো হয়েছিল এবং নিয়মিত খাবার দেওয়া হতো না; নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। পাচারকারীরা একপর্যায়ে তাদের মরুভূমিতে ফেলে রেখে যায় — সেখান থেকেই কয়েকজন দুর্দশাগ্রস্ত বাংলাদেশি শ্রমিক মৃতপ্রায় অবস্থায় উদ্ধার করে। সম্প্রতি লিবিয়ায় আটকে থাকা ১৭৬ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে দেশে আনা হয়েছে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের পরিচালক (সহযোগী) শরিফুল হাসান বলেন, মানুষ কেবল অর্থের জন্যই অবৈধ পথে বিদেশে যায় না; সুশাসন ও কর্মসংস্থানহীনতা মূল উৎস। তিনি সতর্ক করেছেন—সমস্যার গহ্বর বুঝে সমাধান না করলে এই অবৈধ অভিবাসন রোধ করা সম্ভব হবে না। লিবিয়া থেকে ফিরে ঝিনাইদহের মতিউর রহমান সাগর, কুষ্টিয়ার তানজির শেখ ও নোয়াখালীর আলমগীর হোসেনসহ ১৭৬ জন একই ফ্লাইটে দেশে ফিরেছেন; তাদের মধ্যে গানফুদা ও তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে আটক ছিলেন যথাক্রমে ১৪১ ও ৩৫ জন।
ভুক্তভোগীদের বর্ণনায়, দালালরা ইতালিতে চাকরি দেয়ার লোভ দেখিয়ে তাদের লিবিয়ায় পাঠিয়েছিল; সেখানে পৌঁছেই মানবপাচারকারীরা তাদের বড় মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয় এবং মাসাব্যাপী নির্মম নির্যাতন চালায় — পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ে নির্যাতনের ভয়াবহ দৃশ্যাবলী ব্যবহার করা হয়। একাধিক ক্ষেত্রে উদ্ধার হলে দেখা গেছে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা আদায় করা হয়েছে; এমনই একটি ঘটনায় দুই ভুক্তভোগী প্রায় ৭০ লাখ টাকা পরিশোধ করেও নির্যাতন থেকে মুক্তি পাননি।
আরও
ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টার, সিভিল এভিয়েশন ও অন্যান্য অংশীদারদের সহায়তায় গত আট বছরে বিমানবন্দরে ফেরতপ্রাপ্তদের জরুরি সহায়তা প্রদান করে ৩৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে সহায়তা করা হয়েছে। ২০২৪ সালেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৪০ জন প্রবাসী উদ্ধার করা হয়েছে—এবং সাম্প্রতিককালে ইউরোপ, আমেরিকা ও লিবিয়া থেকে শত শত বাংলাদেশি ফেরত পাঠানো হয়েছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা একদেশের ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বিমানে ব্যবহৃত রুট ও সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দরগুলোতে সম্মিলিত মনিটরিং এবং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ অপরিহার্য।
গবেষণা ও পরিসংখ্যান উদীয়মান একটি ভয়াবহ চিত্র দেখায়: অবৈধভাবে ইউরোপে যাবার পথে অধিকাংশই (৯৩%) কোন না কোন ক্যাম্পে বন্দি হন এবং প্রায় ৭৯% শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। বিশেষজ্ঞরা অনুল্লিখিতভাবে সতর্ক করেন—বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন যেন মৃত্যুযাত্রায় না বদলে যায় তার জন্য সচেতনতা বাড়ানো, আকর্ষণীয় লোভময় প্রলোভন নিরুদ্ধকরণ ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া অত্যাবশ্যক।











