ঢাকার পুরানা পল্টনের একটি বাড়ি, আড়ম্বরপূর্ণ অফিস ও নামি গাড়ি দিয়ে নিজের কূটনৈতিক পরিচয় লুকিয়ে রাখতেন মশিউর রহমান। প্রথম দেখায় মনে হতো, তিনি একজন সফল ও প্রভাবশালী কনস্যুলার। তবে বাস্তবে তিনি পরিচালনা করতেন আন্তর্জাতিক ‘ভুয়া ভিসা’ চক্র, যেখানে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন, সঞ্চয় এবং ভবিষ্যৎকে ব্যবসার ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তার এই প্রতারণার হাতে হাজার হাজার মানুষ নিঃস্ব হয়েছেন।
মশিউর রহমানকে ২০২১ সালের ৪ মার্চ বাংলাদেশে বেলিজের অনারারি কনসাল জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। মূল দায়িত্ব ছিল দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও কনস্যুলার সেবা নিশ্চিত করা। তবে এসবের আড়ালে তিনি এবং তার স্ত্রী, ডেন্টিস্ট রুমানা আফরোজ, মানুষের আস্থা ভাঙা প্রতারণার নকশা সাজিয়েছিলেন। তারা ভুয়া ভিসা, নকল সিলমোহর, চার্টার্ড বিমানের ভুয়া টিকিট এবং সাজানো ভিআইপি ছবি ব্যবহার করে মানুষের সম্পদ হাতিয়ে নিতেন।
প্রতারক চক্রটি অত্যন্ত সুচারু ছিল। প্রতারিত ব্যক্তি ভিড়ের মধ্যে পড়ে অর্থ ও পাসপোর্ট জমা দিলে, মশিউরের অফিসি স্টাফরা ভুয়া ভিসা ও ম্যানপাওয়ার ছাড়পত্র তৈরি করত। এরপর টিকিটও কাটত, কিন্তু ফ্লাইটের আগের দিন তা বাতিল হয়ে যেত। ফলে গ্রামীণ ও শহরের সাধারণ মানুষ তাদের সঞ্চয়, দোকান-বাড়ি, এমনকি ঋণ করে দেওয়া অর্থও হারাতেন। নূর মিয়া এবং মো. সোহাগ হোসেনের মতো শতাধিক মানুষ এখন নিঃস্ব, কেউ কেউ নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাড়ি ফিরতে পারছেন না।
আরও
মশিউরের এই চক্রে অফিস ব্যবস্থাপনাসহ ভুয়া কনস্যুলার কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন বিএমইটি কর্মকর্তাও। অফিসে বসে তারা ভুয়া ভিসা দেখিয়ে, ফটোশপে সম্পাদিত ছবি ব্যবহার করে মানুষকে ফাঁদে ফেলতেন। প্রতারিতদের পাসপোর্ট ও ক্লিয়ারেন্স নম্বর গণমাধ্যমের হাতে এসেছে, যা প্রমাণ করে চক্রের বিস্তৃতি। অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মশিউর ও তার স্ত্রী পালিয়ে গেছেন এবং তাদের কোথায় অবস্থান তা জানা যায়নি।
প্রতারণার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি বহুমাত্রিক প্রতারণা। কনস্যুলার নিজেই যদি ফাঁদ পাতেন, তবে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সঠিক তদন্ত করলে মানব পাচার ও অর্থপাচারের মতো গুরুতর অপরাধের ছদ্মলক্ষ্যও সামনে আসতে পারে।













