নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর নেওয়া এক কঠোর কূটনৈতিক অবস্থানে বেশ বিপাকে পড়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। এর জেরে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রির পূর্বনির্ধারিত কাঠমান্ডু সফর শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে, যা হিমালয় কন্যা নেপালের সঙ্গে দিল্লির বর্তমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। সোমবার (১১ মে) দুই দিনের এক সরকারি সফরে তাঁর নেপালে পৌঁছানোর কথা থাকলেও, ভারতের পক্ষ থেকে ‘অন্যান্য ব্যস্ততা’র কারণ দেখিয়ে এই সফর পিছিয়ে দেওয়া হয়। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল সংক্রান্ত কঠোর অবস্থান এবং সীমান্ত নিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া বিবাদই এই গুরুত্বপূর্ণ সফর স্থগিতের মূল নেপথ্য কারণ। নেপালি সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টের এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
কাঠমান্ডুর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান এই কূটনৈতিক অচলাবস্থার পেছনে দুটি প্রধান কারণ সক্রিয় রয়েছে। প্রথমত, নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদমর্যাদার নিচে কোনো বিদেশি কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ করবেন না। এর ধারাবাহিকতায় তিনি ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানান; উল্লেখ্য, এর আগে তিনি মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সমীর পল কাপুর এবং বিশেষ দূত সার্জিও গরের সঙ্গেও একই কারণে সাক্ষাৎ করেননি। দ্বিতীয়ত, তিব্বতের মানসসরোবর যাত্রার জন্য বিবাদপূর্ণ লিপুলেখ গিরিপথ ব্যবহারের বিষয়ে ভারত ও চীনের সাম্প্রতিক দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা নেপালকে চরম ক্ষুব্ধ করেছে, যা তারা নিজেদের ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করছে।
গত এপ্রিলে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির নিরঙ্কুশ জয়ের পর বালেন্দ্র শাহর নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হলে দিল্লির সঙ্গে সুসম্পর্কের আশা করা হয়েছিল; কিন্তু সীমান্ত ইস্যুতে তারা অত্যন্ত অনড়। ১৮১৬ সালের সুগৌলি সন্ধি অনুযায়ী লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি অঞ্চলকে নেপালের অবিচ্ছেদ্য অংশ দাবি করে বর্তমান সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর পাউডিল ছেত্রী গত শুক্রবার এক ব্রিফিংয়ে এই অবস্থানের কথা পুনরুল্লেখ করে জানান, বিষয়টি ইতিমধ্যেই ভারত ও চীন উভয় দেশকেই আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ১৯৫৪ সাল থেকে চলে আসা মানসসরোবর যাত্রার বিষয়ে নেপালের এই ‘একতরফা’ দাবি ভারত মেনে নেবে না, যদিও তারা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথ এখনো খোলা রেখেছে।
আরও
সাবেক নেপালি রাষ্ট্রদূত বিজয় কান্ত কর্ণ ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিবের এই সফর স্থগিত হওয়াকে নেপালের জন্য একটি কৌশলগত ক্ষতি হিসেবে দেখছেন। কারণ, এই সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহকে ভারত সফরের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দেওয়া। তবে এখনই এই ঘটনাকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় কোনো কূটনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে না। আগামী ১ জুন নেপালি পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালের দিল্লি সফরের সূচি এখনো বহাল রয়েছে, যেখানে তিনি একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেবেন। এছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও নেপালে পেট্রোলিয়াম পণ্য ও রাসায়নিক সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে ভারত সুস্পষ্ট আশ্বাস প্রদান করেছে, যা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।









